• শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২০

চীন-ভারত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

চীন ও ভারতের মধ্যে বার বার সামরিক উত্তেজনা কেন হয়? কোথায় লুকিয়ে আছে দ্বন্দ্বের অন্তর্নিহিত কারণ? কেন বার বার সৃষ্টি হয় যুদ্ধাবস্থা?  চীন-ভারত মুখোমুখি হলেই সামনে চলে আসে এসব প্রশ্ন।  
চীন ও ভারতের মধ্যকার সীমানাকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সংঘাতপূর্ণ এলাকা। কেননা, দুটি দেশের কেউই সীমান্তরেখা মেনে নিতে একমত নয়। চীনের দাবি অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সীমান্তরেখা ছিল, তাতে অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখের কিছু অংশ তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ব্রিটিশরা ১৯১৩ সালে সিমলা চুক্তিতে যে সীমান্তরেখা নির্ধারণ করে,  (ম্যাকমোহন লাইন এবং অন্যান্য লাইন) সেটা চীন কখনো মানেনি। পক্ষান্তরে ব্রিটিশদের চিহ্নিত সেই সীমারেখাই ভারত বরাবর  দাবি করেছে।
চীন-ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে যে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে, তা-ই উভয় দেশের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা ও  দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ। তদুপরি, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থগত আরো কিছু দ্বন্দ্বও এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর এবং বিপুল আয়তন ও জনসংখ্যার দেশ দু’টির মধ্যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিরাজ করছে।   
নিকট-প্রতিবেশী হলেও চীন-ভারত প্রথম যুদ্ধ হয় ১৯৬২ সালে। https://0d1b93898828e6054255afe990db3698.safeframe.googlesyndication.com/safeframe/1-0-37/html/container.html তবে সেই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্নতর। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সদ্য-স্বাধীন ভারত সরকার মার্কিন বিমানবাহিনীকে ৬টি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন বাহিনী চীনের ভেতর কমিউনিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বলে চীনের অভিযোগ। তদুপরি, ১৯৫০ সালে যখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন তিব্বত পুর্নদখল করে, তখন সেখানে একটি গেরিলা গোষ্ঠী চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়। এই গেরিলা গোষ্ঠীকে গোপনে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র মদত যুগিয়েছিল, এমন মত চীনের। এমনই প্রেক্ষাপটে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল।
১৯৬২ সালের বড় আকারের যুদ্ধের পর  ১৯৮৮ সালে এবং ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০৫, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় চীনের সঙ্গে। প্রত্যেক চুক্তিতেই বলা হয়েছে, সীমান্ত বিবাদ নিরসনে আলোচনা চলবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক বহাল থাকবে বাণিজ্যকে এগিয়ে নেওয়া হবে যৌথভাবে।

এতো চুক্তি ও আলোচনার পরেও  একাধিক বার দেশ দুটি মুখোমুখি হয়েছে। এমন কি ২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস প্রকোপের মধ্যেও চীন-ভারত রেষারেষি ও উত্তেজনার কমতি নেই।
কাগজের চুক্তি যে বাস্তবে ফলদায়ক হয় না, তার দৃষ্টান্ত রয়েছে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা ও সংঘাতে।  ২০১৩ সালে ডেপসাং উপত্যকায় চীনা সেনারা ভারতের ১৯ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র  মোদী ক্ষমতায় আসার পর চুশুল এবং ২০১৭ সালে দোকলামে চীনা সেনা প্রবেশ করে। ডোকলাম সংঘাত চলে ৭২ দিন। এবার ২০২০ সালের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা।

যখন দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তখনই যুদ্ধ বাধে। চীন-ভারতের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, আলোচনা ভেঙে গেছে, যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেছে, আবার আলোচনা হয়েছে, এই হলো অবস্থা। তবে দুটি দেশেরই বিপুল অস্ত্রসম্ভার রয়েছে এবং এসব অস্ত্রশস্ত্র বেশ আধুনিক। ফলে চীন-ভারতের মধ্যে আলোচনা আর সশস্ত্র মহড়া চলেছে পাশাপাশি।
বছরের পর বছর ধরে দুটি দেশ শুধু আলোচনাই করেনি, নিজেরাও সমরাস্ত্র তৈরি করেছে এবং প্রচুর অস্ত্র আমদানিও করেছে। বিশেষ করে ভারত পরপর পাঁচ বছর বিশ্বের সবচাইতে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের স্থান দখল করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইসরায়েল থেকে তারা অনেক অত্যাধুনিক অস্ত্র এনেছে। বিদেশি প্রযুক্তি এনে নিজেরাও অস্ত্র তৈরি করেছে।
একইভাবে চীনা সরকার রাশিয়া থেকে কিছু অস্ত্র কিনেছে। তবে বেশিরভাগ অস্ত্র তারা এখন নিজেরা উৎপাদন করে। কাজেই অত্যাধুনিক অস্ত্র দুপক্ষেরই আছে।
কিন্তু সমস্যাটা হলো গিরিসংকুল পার্বত্য এলাকায় সেইসব অস্ত্র কতটা ব্যবহার করা সম্ভব? সেখানে বিমান বহর এবং ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু সেনাবাহিনী, যারা মাটিতে যুদ্ধ করে, তারা তাদের গোলন্দাজ, সাঁজোয়া বা ট্যাংক বহর খুব একটা ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে করেন না সামরিক বিশেষজ্ঞরা। তারপরেও কিন্ত যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা থেমে থাকেনি দু-দেশের মধ্যে। আবার আলোচনাও চলছে থেমে থেমে। সন্দেহ নেই, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই বৃহৎ দেশের সংঘাত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x