• মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২০

সিলেটে অনেকেই মাটিতে পুঁতে ফেলছেন চামড়া

২০১৯ সালে সিলেটসহ সারাদেশে কোরবানির পশুর চামড়ার দামে যেভাবে ধস নেমেছিল, এবারও সেই একই অবস্থা। বেশি দামে বিক্রির আশায় যারা শহর, নগর, গ্রাম, গঞ্জ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছেন, তারা এখন হতাশায় নিমজ্জিত। কারণ, চামড়ার দাম সিলেটে এবার খুবই কম। একটি গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ২০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে! বড় আকারের গরুর একটি চামড়া সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা নির্ধারণ করেছে। সারাদেশে প্রতি বর্গফুট খাসির কাচা চামড়া ১৩-১৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১০-১২ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শনিবার (১ আগস্ট) পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিলেটে প্রায় দুই লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। দুপুরের পর থেকে সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয় নগরের তালতলা, রেজিস্ট্রি মাঠ, কিনব্রিজের উত্তর ও দক্ষিণ পাড়, আম্বরখানা এবং ভার্তখলা আড়তে। প্রতি বছরই এসব স্থানে হাজার হাজার চামড়ার স্তূপ জমে।

শনিবার বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গরুর চামড়া একেবারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। আর খাসি বা বকরির চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীরা আগ্রহই দেখাচ্ছেন না। এ কারণে সিলেটে ছাগলের চামড়া পাইকারি ব্যবসায়ীদের অনেকে ফ্রি দিয়েছেন।

মৌসুমী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নগরীর বাসাবাড়িতে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে এনেছেন। কোনো কোনো বাসা-বাড়ি থেকে কওমি মাদরাসার ছাত্ররাও চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এ বছর চামড়া সংগ্রহে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কম থাকায় যারা কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটাকুটিতে নিয়োজিত ছিলেন কাজ শেষে তাদেরকেও চামড়া নিয়ে যেতে দেখা গেছে।

তবে কানাইঘাটে এবারও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দামে চামড়া কিনতে ক্রেতাই পাওয়া যায়নি। এ কারণে অনেকে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। পানির দামে গরুর চামড়া বিক্রি হলেও প্রায় একেবারেই ‘নাই মূল্য’ ছিল ছাগলের চামড়ার। অনেক ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী ছাগলের চামড়া এমনিতেই রেখে এসেছেন।

সিলেট নগরের উপশহরের বাসিন্দা আবদুল আহাদ জানান, কোরবানি হিসেবে তিনটি খাসি জবাই করেছি। কোনো চামড়া ব্যবসায়ী কিনতে না আসায় শেষ পর্যন্ত চামড়া রেজিস্টারি মাঠের সামনে রেখে এসেছি।

কানাইগাটের কোরবানি দাতারা বলছেন, দিনভর কোরবানি চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করলেও ক্রেতারা আসছেন না। আবার অন্য বছর স্থানীয় মাদরাসা কিংবা এতিমখানা চামড়া নিলেও এবার তারাও নিচ্ছেন না পশুর চামড়া। আর নিজেদের সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে দিতে হচ্ছে।

গত বছর বিভিন্ন এলাকায় অনেক চামড়া ব্যবসায়ীরা এক প্রকার পানির দামে চামড়া ক্রয় করলেও এ বছর কানাইঘাট উপজেলার কোথাও কোনো চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা যায়নি। যার কারণে রফতানিযোগ্য অনেক মূল্যবান পশুর চামড়া কেউ কিনতে না আসায় লাখ লাখ টাকার চামড়া পুঁতে ফেলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বারিউল করীম খানকে ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সিলেটের রেজিস্ট্রি মাঠে চামড়ার এক আড়তদার নাম প্রকাশ না করে বলেন, ছোট গরুর চামড়া কেনাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ছাগলের চামড়া কিনে কী করবেন। গরুর চামড়ার সঙ্গে অনেকে ছাগলের চামড়া যারা নিয়ে এসেছেন, তারা ফ্রি দিয়ে গেছেন।

দুজন মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী জানান, ছাগলের চামড়ার সর্বোচ্চ দশ টাকা দাম পেয়েছেন তারা। সিলেটে ছাগলের চামড়ার এমন করুণ পরিণতি গত তিন বছর ধরেই চলছে। সারাদেশেও একই অবস্থা বলে জানা গেছে।

এদিকে, সিলেটে বড় আকারের গরুর চামড়া প্রতি পিস ৭০- ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। কিন্তু ছোট আকারের গরুর চামড়া প্রতি পিস ২০-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সরকার যে দর নির্ধারণ করেছে, সে দরে চামড়া বিক্রি হয়নি।

খুচরা চামড়া ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি দেড়শ থেকে দুইশ টাকা দামে বাসাবাড়ি থেকে একেক পিস চামড়া ক্রয় করেছেন। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীরা, যারা ট্যানারিতে নিয়ে চামড়া বিক্রি করেন, তারা নানা কারণ দেখিয়ে দাম বেশি দিতে নারাজ। এতে তিনিসহ খুচরা ও মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

সিলেট সদর উপজেলার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন বলেন, ‘গরুর এক পিস চামড়া ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ আমরা বাইরে থেকে গাড়িভাড়া দিয়ে চামড়া কিনে এনেছি অনেক বেশি দামে। এখন গাড়িভাড়াও নিজেদের ওপর পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘২০০ টাকা দিয়ে ক্রয় করা এক পিস চামড়া কিনে এনেছি। এখন পাইকারি ব্যবসায়ীরা এমন দামি চামড়ার বলছেন ৫০ -৭০ টাকা।

তিনি বলেন, ‘গতবছর ৫০ হাজার টাকা লস হয়েছে। এ বছরও লস হলে উপায় নাই। চামড়ার দাম একেবারেই নাই বললেই চলে।’

সিলেটে খুচরা ও মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক চামড়া ক্রয় করে ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারিতে বিক্রি করেন, এমন চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা তাদের টাকা আটকে রেখেছেন। আগের টাকা পাওনা থাকায় তারা নতুন করে চামড়া কেনায় বিনিয়োগ করতে পারছেন না। মূলত পুরোনো পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার আশাতেই এখন কম দামে চামড়া কিনে ট্যানারিগুলোতে সরবরাহ করছেন তারা।

আড়ৎদার চামড়া ব্যবসায়ী আকরাম আলী, ‘চামড়া শিল্প একটা ভালো খাত ছিল দেশের জন্য। সেটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গত বছরও (দাম না পাওয়ায়) অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে। হাজার হাজার চামড়া সুরমা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। এ বছরও প্রচুর চামড়া নষ্ট হবে।’

Leave a Reply

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x