• শনিবার, জুলাই ৪, ২০২০

জাতীয় সাংবাদিকতায় সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান এম.বশির আহমদঃ স্মৃতিতে শ্রদ্বার্ঘ্য

Posted on by

এ .টি .এম কয়েছঃ

“আজি হতে শতবর্ষ পরে

কে তুমি পড়িছ বসি

আমার কবিতাখানি

কৌতুহল ভরে”

কবিগুরু’র অমর পঙক্তি -তে শ্রদ্বার্ঘ্য! সাংবাদিকতায় জাতীয় পর্যায়ে সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান, মুক্তিযোদ্বা সাংবাদিক এম.বশির আহমদ এর অনবদ্য কীর্তিময় স্মৃতিতে!

ষাটের দশকের সিলেটের তুখোর ছাত্র নেতা এম.বশির আহমদ এর জন্ম ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে ডিসেম্বর ছাতকে’র গোবিন্দগন্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী জালালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁহার পিতা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী, কংগ্রেস নেতা বাবু হেমেন্দ্র দাশ পুরকায়স্থের ঘনিষ্ঠ সহচর ও বন্দ্বু, খ্যাতিমান ব্যবসায়ী, তৎকালে সরেপঞ্চ (পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ) মি.ইউনুছ  আলী।

তৎকালে ধনাঢ্য ও সমাজ সচেতন পরিবার এর সন্তান এম.বশির আহমদ যেমন সুঠাম, তেমনি ডানপিটে প্রতিবাদী মনোভাবের ছিলেন হাইস্কুল জীবন থেকেই। রাজনৈতিক ডামাডোলের  সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকার দায়ে বহিস্কৃত,বহিষ্কার এর বেড়াজালে তিনি সুনামগঞ্জের রঙ্গারচর হাইস্কুল, সিলেটের দি এইডেড হাইস্কুল, রাজা.জি.সি তে পড়ালেখা করলেও শেষাবধি  সিলেট গভঃবয়েজ স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন করেন ১৯৬১ সালে।

অতঃপর শিক্ষাজীবনে তিনি সিলেট এম.সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, মদন মোহন কলেজ থেকে বি.কম. ডিগ্রী এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল কলেজে আইন শাস্ত্রেও অধ্যয়ন করেন।

ছাত্ররাজনীতিতে এম.বশির আহমদ, ছাত্র শক্তি তে যুক্ত হয়ে ‘৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে এবং সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে সিলেটের প্রথম সারির অন্যতম ছিলেন। তৎকালে বৃহত্তর  সিলেট জেলা ছাত্র শক্তির সভাপতি হিসেবে তিনি ‘কপ’ ‘ডাক”এন.ডি.এফ.এর নেতৃত্বে উত্তাল আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। নেতৃত্বের বলিষ্ঠতায় তিনি ১৯৬৫-৬৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদ এর ভি.পি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ তে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট স্বৈরশাসক আইয়ূব খান সিলেটে আগমন কালে সার্কিট হাউজের সভায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও জুতো নিক্ষেপের বিপ্লবী ০৭ ছাত্রনেতাদের অন্যতম এম.বশির আহমদ। তাঁহার সহচর তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্র লীগের সেক্রেটারী, পরে সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্বা প্রয়াত শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন অন্যতম পুরোধা। এর দায়ে কেবল মামলা নয় তাঁদের ওপর হুলিয়াও জারি হয়।১৯৬৫ সালে ফাতেমা জিন্নাহর প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশানে ভরাট বজ্রকন্ঠের বক্তা ও ছাত্র নেতা হিসেবে বিখ্যাত রাজনীতিবিদ দেওয়ান ফরিদ গাজীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

তিনি ১৯৬৭ এ ঢাকায় সেন্ট্রাল ‘ল কলেজে পড়াকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে   ‘৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে বিরাট ভূমিকা পালন করেন।

সেই টালমাটাল সময়ে তিনি সাংবাদিকতায় ব্যারিস্টার শওকত আলীর  “সাপ্তাহিক জনতা”-য় যুক্ত হন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা সংগ্রাম  শুরু হলে তিনি ভারতের আগড়তলা চলে যান এবং সেখান থেকে দেশপ্রেমে  জীবনের ঝুঁকি নিয়ে  “সাপ্তাহিক জনতা”-য় রণাঙ্গনের দুঃসহ -দুঃসাহসিক সংবাদ,কলাম, রক্তাক্ত যুদ্ধের লোহমর্ষক প্রতিবেদন লিখে ” মুক্তিযোদ্বা সাংবাদিক “হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁহার অবদান অসামান্য ।দেশস্বাধীন এর পর তিনি প্রাচীনতম দৈনিক আজাদ এ যোগদেন এবং কূটনৈতিক রিপোর্টার ও ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধু ‘র ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর  এম.বশির আহমদ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে  যোগদানপূর্বক বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের  কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। এতে প্রেরণা যুগান সুনামগঞ্জের রত্নসন্তান জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ। ফলে, ১৯৭৩ সালে র সংসদ নির্বাচনে দু’টি আসনে বিজয়ী সামাদ আজাদ সুনামগঞ্জ -৫ ছাতক-জগন্নাথপুর আসন ছেড়ে  দেয়ার ফলে উপ-নির্বাচনে এম.বশির আহমদ জনমত জরিপে এগিয়ে এবং  পার্লামেন্টারি বোর্ডে সিদ্বান্তের পরও বঙ্গবন্ধু একক সিদ্ধান্তে একান্তভাবে  এম.বশির আহমদ কে শান্তনা দিয়ে  বললে, তিনি সরে দাঁড়ান;বঙ্গবন্ধুর প্রতি কতটা অনুরাগ ছিল এ থেকেই অনুমেয়।  বঙ্গবন্ধু তাঁহাকে  নামধরে ডাকতেন এবং স্নেহ করতেন।একই জেলার সুবাদে আবার সামাদ আজাদ এর জীবনভর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ঐ ইলেকশানে আকমল আলী মোক্তার জামানত হারান।

সাংবাদিকতায় এম.বশির আহমদ, ১৯৭৪ এর দিকে বিখ্যাত দৈনিক সংবাদ এ সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন। অতঃপর বিশেষ প্রতিনিধি এবং চীফ রিপোর্টার হিসেবে 

  দীর্ঘদিন  সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করে বার্ধক্যজনিত কারণে ২০০১ সালে অবসর নেন।

‘৭০-এর দশকে ঢাকায় সাংবাদিকতায় অপরাধ, ক্রাইম, পুলিশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এক দাপুটে ও খ্যাতিমান সাংবাদিক ছিলেন তিনি।স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রাইম রিপোর্টারদের একজন অগ্রণী সংগঠক ছিলেন তিনি।ফলে,এরশাদ জমানায় ‘৮৪ এর দিকে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টাস এসোসিয়েয়ন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন পুরোধাদের অন্যতম এবং যুগ্ম আহ্বায়ক। সামরিক ও স্বৈরাচারী জমানায় দেশে ক্রাইম,অপরাধ ও ব্যুরোক্রেটিক করাপশনের বিরুদ্ধে এম.বশির আহমদ নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও সাহসীকতার সাথে কমম সৈনিক হিসেবে দেশ ও জাতির স্বপক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন বীর দর্পে।

জাতীয় পর্যায়ে ক্রাইম সাংবাদিকতায় বরেণ্য ও বিশিষ্ট এই ব্যক্তিত্ব ঢাকাস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন এর সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং সুনামগঞ্জ মহুকুমা কে জেলায় রূপান্তর আন্দোলনে ঢাকায় সংগঠক ছিলেন।  সাংবাদিকতার ইতিহাসে সুনামগঞ্জের এই রত্ন সন্তান 

২৪শে জানুয়ারী ২০১৯ এ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁহার কন্যা-রওশন জাহান সুমি (এম.এ) এবং পুত্র -ডা.সালেহ আহমদ শাওন ।  তাঁহার মেঝো ভাই আশির দশকে গোবিন্দগন্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের স্বনামধন্য চেয়ারম্যান মনসুর আহমদ(মনছর) এবং কনিষ্ঠ ভাই আমেরিকা প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক গিয়াস উদ্দিন আউয়াল।

উল্লেখ্য, তিনি ছাতকে ‘৯০-দশকে’র ছাত্রনেতা,যুক্তরাজ্য স্বেচ্ছাসেবক লীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক আলিম উদ্দিন আহমদ  এর বড় চাচা।

প্রভু, তাঁহার বিদেহী আত্মার শান্তি দান করুন।(সংক্ষেপিত)

Leave a Reply

More News from এক্সক্লুসিভ

More News

Developed by: TechLoge

x