• মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২০

ভালোমন্দে ভালো থেকোঃ একটি সহজ-ব্যঞ্জনায় জীবনের প্রতিচ্ছবি

Posted on by

এ কে এম আব্দুল্লাহঃ

‘ভালোমন্দে ভালো থেকো’ কবি তালুকদার রায়হান- এর কবিতার বই। বইটি দুহাজার উনিশ সালের মহান একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বইটি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। বইটিতে মোট চুয়ান্নটি কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে। বেশ কিছু কবিতা কবি তার প্রিয় কবিদের উৎসর্গ করেছেন। বিষয়টি প্রসংশনীয়। পুরো বইটি উৎসর্গ করেছেন তার বাবা মা-কে। পরিবার পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত বইটি প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ুব আল আমিন।
কবি তালুকদার রায়হানের কবিতার সাথে আগে থেকেই আমি কিছুটা পরিচিত। এবার তার ‘ভালোমন্দে ভালো থেকো’ বইটি পড়ে মনে হয়েছে, কবি নিজেকে ভাঙার প্রয়াস যে করেননি তা নয়। বরং মনে হয়েছে বেশ কিছু কবিতায় নিজেকে ভেঙে নতুন ভাবে উপস্থাপন  করেছেন আমাদের সম্মুখে। একজন কবি তার ভাবনায় বার বার নিজেকে ভেঙে কবিতাকে নতুন নতুন রূপে নিয়ে আসবেন পাঠকের সামনে। এটাই কাম্য। আর সে ভাঙার মধ্যেই নিহিত রবে কবিতার সুখপাঠ্য।
কবি তালুকদার রায়হানের ভালো মন্দে ভালো থেকো বইটিতে রয়েছে চমৎকার কিছু কবিতা। গ্রন্থটির প্রথম কবিতার শিরোনাম  ‘আয়েন্দা’। এ কবিতার শুরুটা এভাবেই করেছেনঃইমেইল আগ্রাসনে বিকলাঙ্গ রানার / ভার্চুয়াল জগতের জয়গানে তৈয়ব চাচার হুক্কার টিকি শেষ / তথ্যপ্রযুক্তির যুগান্তকারি উন্নয়নে পৃথিবী থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, আবার যোগ হচ্ছে নিত্য নতুন কিছু। এই কবিতায় কবি, তার-ই যেমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন; তেমনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন আগামি সময় নিয়ে। ‘ভালোমন্দে ভালো থেকো’ বইটির কবিতা পড়ে মনে হয়েছে কবির স্মৃতি কাতরতা আর দেশপ্রেম যেন কবিতাগুলোতে প্রখর হয়ে ওঠেছে। ‘ফেরারি সম্বেদন’ কবিতায় লিখেছেন -উড়ে যাই সবুজ ধান ক্ষেত পেরিয়ে / উদনা গাঙের তীরে হাঁসছানাদের ভিড়ে … একই কবিতার শেষের দিকে লিখেছেন— রানি এ্যালিজাবেথের রাজ্যে / সিগন্যালবাতি সবুজ হলেই দেখি/  মায়ের পরনে এখনও ব্লাউজ ছাড়া আটপৌরে শাড়ি …  
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে যাপিত জীবনের যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। আমাদের যাপিত জীবনের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল তরঙ্গে। এই পরিবর্তনের ভেতর কবি খোঁজেন তার শৈশব।‘অনাগত সূর্যালোক’ কবিতায় লিখেছেন -গরুর গাড়িতে চড়ে বেড়ানো/ঘোড়ার টমটমের টগবগ ছন্দ/মুড়িরটিন বাসের গড়গড় আওয়াজ/ ভিউকার্ডের আদান প্রদান … আসলেই, এসব যেন এখন শুধুই স্মৃতি। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এ যেন রূপকথার গল্পের মত। কবিতাটি শেষ হয় এভাবে -রোবট শোনাবে মৃত সময়ের গল্প/ তুমি হয়ত বলবে – যত্তোসব অসহ্যকর!
‘পিতা’ শিরোনামের ছোট কবিতাটি পাঠকদের নিয়ে যাবে ধ্যানজগতে। কবিতাটি ছোট হলেও এর ব্যাখ্যা ব্যাপক। কবিতাটি কিছু সাংকেতিক সংখ্যা দিয়ে শুরু হলেও; শেষ হয়েছে এভাবে -প্রথম চিৎকার হতে শেষ শব্দ অবধি/যা কিছু আমার,যা হবে আমার/ যা রবে আমার,অর্ধেক হিস্যা তোমারই/পিতা,তুমি এই অদ্ভুত সত্তার স্বত্বাধিকারী। 
‘পোড়া বাঁশি’ একটি চমৎকার কবিতা। কবিতাটিতে ফুটে ওঠেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র। কবিতার শুরুটা হয়েছে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় -আমি যখন এক্কেবারে হুরু হাপপেন পিন্দি …ও আইচ্ছা,আপনি তো আবার ছিলটি ভাষা বুঝবেন না অতোটা / আমি যখন খুব ছোট সেই হাফপ্যান্ট পরার সময়ের কথা …চমৎকার দীর্ঘ একটি কবিতা। এই কবিতায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চিত্র যেভাবে ফুটে উঠেছে, সেভাবে হিন্দু মুসলিম ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে যুদ্ধ করেছেন তার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠেছে।মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত এই কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতি প্রকাশে কবি সার্থক হয়েছেন বলবো। বইটির প্রায় কবিতায়-ই দেশ এবং দেশের মানুষের জীবন যাপনের বিষয় বিভিন্ন ভাবে ফুটে ওঠেছে। 
কবিতা ভাবনা কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। থাকবেও না। কবিরা কবিতা লেখছেন। লেখবেন। সময়ের পরিবর্তনে কবিতার এই বাঁক বদলে – শব্দচয়ন, বানান, ছন্দ কিংবা উপমায় আরও যত্নশীল হওয়া সময়ের দাবী। 
কবি তালুকদার রায়হানের ‘ভালোমন্দে ভালো থেকো’ চমৎকার প্রচ্ছদের বইটি আরও পাঠকপ্রিয় হবে প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার  

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x