• মঙ্গলবার, জুলাই ২৩, ২০১৯

ভুল অধিকারে ভালবেসেছিলাম তাকে

Posted on by

সালমা  সুলতানা:
আমি জানি না ‘প্রকৃতি’নামক একটি ভালোবাসার বীজ,  কে বপন করে দিয়েছিল আমার ভেতরে।তাকে ভালোবাসতে শিখেছি যখন অন্য কোন ভালোবাসার নিগূঢ় অর্থ আমার বোধগম্য ছিল না। ভীষণ চঞ্চল,অস্হির মেয়েটা ভালোবাসতো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, মন উদাস হতো  মেঘলা আকাশ দেখে। মুগ্ধ হতো বুনো ফুলের মাতাল গন্ধে, টলটলে জলের উপর ভেসে থাকা হিজল ফুলের সবটুকু সৌন্দর্য উপভোগ করতো দু’চোখ ভরে । শান্ত দুপুরে গাছের পাতার গায়ে ঝিরিঝিরি বাতাসের ছোঁয়ায় যে ঐকতানের সৃষ্টি হতো, তা উপলব্ধি করতো হৃদয় দিয়ে। বৃষ্টি-ধোয়া সবুজ পাতায় জমে থাকা জলের উপর রোদ পড়ে  চিকচিকে যে হাল্কা দ্যুতি ছড়াতো,  তা-ও তার দৃষ্টি এড়াতো না কখনো। ষড়ঋতুর আলাদা আলাদা গন্ধে এক ধরনের সুখানুভূতি হতো তার ভেতরে। জলের উপর ভেসে থাকা শাপলা, কলমী লতা দেখে,  তারও ইচ্ছে হতো ভেসে থাকতে  কিংবা ছুঁয়ে দেখতে।বসন্ত ঋতুর হাল্কা মিঠে রোদে কৃষ্ণচূড়া কিংবা  পলাশ-শিমুলের টকটকে লাল রঙের মোহনীয় রূপে রঙিন হতো  তার মনও। শীতের সকালে কুয়াশা-ভেদী সূর্যের হাসিতে হেসে উঠতো তার মনটাও। ভোরের শিশির সিক্ত ঘাসে পা ডুবাতে কী যে ভাল  লাগতো বালিকার! নদীর দু’ধারে মৃদুমন্দ  বাতাসে দুলতে থাকা  শুভ্র কাশফুলের পেলব ছোঁয়া, যেন ছুঁয়ে যেতো তার মনের আনাচ কানাচ। নির্জন দুপুরে আপন মনে একাকী বয়ে  চলা নদীর জলের ছোট ছোট ঢেউয়ের উপর প্রখর  রৌদ্র পড়ে যে অদ্ভূত সৌন্দর্যের সৃষ্টি হতো, তা দেখতো সে আপন মনে। কি যে রূপবতী  লাগতো শান্ত-শিষ্ট তটিনীকে! মনে হতো যেনো রূপোর গয়না পরেছে  জলকন্যা। সন্ধ্যার অন্ধকারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা দোপাটির চোখ ধাঁধানো রং দেখতো সে  অবাক বিস্ময়ে! আঁধো আলোয় দোপাটির দৃষ্টি, কেমন রহস্যময় লাগতো তার কাছে। পাতার আবডালে বৃষ্টিস্নাত কদমের  উঁকি-ঝুঁকিকে ঘোমটার আড়ালে নব বধূর উৎসুক,লুকানো দৃষ্টির মত মনে হতো তার কাছে। কদম ফুল খোঁপায় জড়িয়ে মুগ্ধ  হয়ে নিজেকে দেখতো কখনো। প্রকৃতির সাথে যেন তার গভীর মিতালী। ভালোবাসতো সবটুকু উজাড় করে।    
বালিকা যতই বড় হতে লাগলো প্রকৃতির প্রতি তার মুগ্ধতা ততই বেড়ে চলল।আস্তে আস্তে তার গোপন ইচ্ছে গুলো   পাখা মেলতে  শুরু করলো—বিয়ের পর যদি দখিনের    জানালা লাগোয়া একটি কদম গাছ থাকতো! যাকে সে হাত  বাড়িয়ে  ছুঁয়ে দিতে পারবে যখন তখন। তার বৃষ্টিস্নান দেখবে। নিজ হাতে ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় জড়িয়ে  অপেক্ষায় থাকবে কারো ঘরে ফেরার! সৃষ্টিকর্তা তার সৎ গোপন ইচ্ছে কবুল  করে নিয়েছিলেন।    একান্নবর্তী পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ হলাম প্রকৃতিপ্রেমী   সেই আমি। দখিনা-বারান্দার একটি রুম পেয়েছিলাম  ঠিকই । তবে কদম গাছ ছিল না।  কিছুদিনের মধ্যেই বাবা,  আমার শ্বশুর ,  একটি  কদম গাছ লাগালেন বারান্দার একদম কোল  ঘেষে। কিন্তু  জায়গাটা আমাদের ছিলো না।বাবার বন্ধুর জমি।আমি যতদূর জেনেছি ১৯৫৩ সালে বাবা ও তাঁর বন্ধু সম পরিমাণ জমি একসাথে কিনেছিলেন।  বাবা নিজ জমিতে বাড়ি  করেছিলেন। কিন্তু চাচা  অর্থাৎ  বাবার বন্ধুর পরিবারের সবাই বরিশালে থাকতেন। যার  ফলে বাবাকেই দেখাশুনা করতে হতো। যেহেতু জায়গাটা  এমনি এমনি পড়ে ছিল, তাই তিনি ফাঁকা জমিটায় নানা  প্রজাতির ফুল- ফলের গাছ লাগিয়েছিলেন। 
বাবাও ছিলেন ভীষণ প্রকৃতি প্রেমী। আমি দেখেছি, তার  অবসরটুকু কাটতো গাছের যত্ন করেই। ঢাকা শহরে থেকেও  তার কারণেই আমরা প্রকৃতির স্বাদ আস্বাদন করতে  পেরেছি।এক সময় নারিকেল গাছ, সুপুরি, আতাফল, আম  গাছ, কলাগাছ সহ অনেক ধরণের ফলের গাছ ছিল আমার  শ্বশুর বাড়ীতে। ফুলও ভালোবাসতেন তিনি। আমার প্রিয় সবগুলো ফুল গাছই পেয়েছিলাম —কামিনী, গন্ধরাজ, গোলাপ, বেলী, হাসনাহেনা, দোপাটি। একমাত্র কদম গাছটিই ছিলো না।ওটা লাগানো হয়েছিল আমার বিয়ের পরে। আমার দখিনের বারান্দা আর চাচার জমির রাস্তার পাশের দেয়াল ঘেঁষে গাছটি লাগিয়েছিলেন বাবা, যাতে ভবিষ্যতে বাড়ি  বানালেও গাছটি কাটতে না  হয়। সে হিসেবে গাছটিকে আমি আতুর ঘর থেকেই দেখছি। আমার  সান্নিধ্যেই তার  বেড়ে ওঠা। ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন সবার  আগে যেতাম বারান্দায়।প্রতিদিন পরখ করতাম তার বড় হওয়ার গতি। ছোট্ট শিশুর মতই হাত-পা  দুলিয়ে দুলিয়ে খেলা করতো। যত বড় হতে থাকলো তার প্রতি  আমার মায়া আরো বৃদ্ধি পেতে থাকলো।দেখতে দেখতে শিশু  থেকে বালিকা,  বালিকা থেকে কিশোরী,কিশোরী থেকে পূর্ণ যৌবনা হল সে। ফুল ছাড়াও ভীষণ রূপবতী লাগতো তাকে। কারণে অকারণে ছুটে যেতাম বারান্দায়। বাতাসের  সাথে ভেসে আসা একটা মিষ্টি গন্ধ ছুঁয়ে যেতো  আমায়। আমিও কম দেইনি তাকে। তার সবুজ পাতায় হাত বুলিয়ে আদর করতাম, ছুঁয়ে দিতাম পরম মমতায়, গভীর  স্নেহে।আর নীরবে সুবোধ বালিকার মত সেও উপভোগ করতো আমার  স্পর্শ। নিস্তব্ধ দুপুর, কিংবা একাকী বিকেল কাটতো তার  সাথেই। ভীষণ সখ্যতা  ছিল তার পাখিদের সাথে। টুনটুনি, চড়ুই, কাক, দোয়েলের অভয়ারণ্য ছিল সে। পাখিদের সাথে যোগ-সাজশে প্রতিদিন ঘুম ভাঙিয়ে দিতো আমার। ভোরের আলো ফোটার আগেই এক  নজর দেখে  নিতাম তাকে। সকালের আধো-আলোয় অদ্ভূত সুন্দর লাগতো। বারান্দায় দাঁড়ালেই স্নিগ্ধ-হিমেল হাওয়া মেখে দিতো আমার চোখে-মুখে।
কোন এক বর্ষায় নব রূপে দেখা দিল সে। গাছে ফুল আসতে   শুরু করলো। পাতার ফাঁকে ছোট ছোট কলি দেখে অতলস্পর্শী ভাললাগা, বেপরোয়া ভালোবাসায় তাকে আরো, আরো কাছে পেতে চাইলাম। গভীর প্রণয়ে আবদ্ধ  হলাম তার সাথে। বার বার ছুটে যেতাম এক নজর দেখার  জন্য। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম গাছটা কেটে ফেলা হবে। কারণ ডাল গুলো একদম রাস্তার উপর ঝুঁকে পড়ছে। চারপাশটায় তেমন সূর্যের আলো পড়ে না। ইলেকট্রিক তারে লেগে যেকোন বিপর্যয় ঘটতে পারে।নানা লঘূ অপরাধের অযৌক্তিক অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ডের মত কঠিন শাস্তি দেওয়ার পায়তারা চলতে থাকে। আমার কষ্টটা আন্দাজ করতে পেরে আমার হাজবেন্ড সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেন। চাচার বড় মেয়ের কাছে আর্জি জানালেন তিনি, কোনভাবে গাছটা না কেটে পারা যায় কি না!  আপারা সবাই ভীষণ ভালোবাসেন  আমাদের। অনেক সময় আত্মার  টান রক্তের বাঁধনকেও ছাড়িয়ে  যায়। আপা বুঝতে পেরেছিলেন এবং গাছটিকে সুরক্ষার ব্যবস্হা করেছিলেন। আমাদের স্নেহ, ভালোবাসায় বেড়ে উঠলেও তার জন্ম এবং বসতি যেহেতু অন্যের জমিতে তাই নানা অজুহাতে বহুবারই তার জীবন নাশের হুমকি  এসেছে।
দুদিন পরে আপা জানালেন গাছটি কাটা হবে না, তবে পাশের কিছু ডাল ছেঁটে দেয়া হবে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন!    বিকলাঙ্গ হয়ে বাঁচুক, তবুও বাঁচুক! ফিরে পেলাম আমার হারাধনকে। কিন্তু ফিরে পেলেও একটা অজানা আশঙ্কায় মনটা ভারী থাকতো।আবার কখন দূর্বিপাক নেমে আসে তার উপর। এ যেন অন্যের একাউন্টে নিজের টাকা রাখার মতো। অধিকারের জায়গাটা বড্ড অসহায় আর নড়বড়ে হয়ে গেল, নিজের ভালোবাসার ধন হওয়া সত্ত্বেও তাকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যাপারটা বড় অনিশ্চিত হয়ে গেল।তাকে হারানোর ভয়ে তার জন্য ভালোবাসাটা যেন আরো বেড়ে গেল।একটু পাতা নড়ার আওয়াজ পেলেই ছুটে  যাই। কতবার যে ঝড়ে তার জীবন বিপন্ন হবার উপক্রম হয়েছে, তার  ইয়ত্তা নেই। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে  গেছে সে।
এমনি করেই সে ছিল আমার সার্বক্ষণিক সংগী,অসংখ্য দুঃখ-সুখের স্মৃতির সাক্ষী। ভোরের বিশুদ্ধতায়, অলস  দুপুরের নির্জনতায়, একাকী বিকেল কিংবা সন্ধ্যার আবছা আলোয়  পেয়েছি তারে আপনার করে। শুনিয়েছি কত গান, কত  কবিতা। কখনো বা সে নিজে হয়েছে আমার লেখনীর অনুষঙ্গ। শ্রাবণ বৃষ্টির একেক ক্ষণে তার একেক রূপে মুগ্ধ হতাম। পাতার  আবডালে ফুটে থাকা ফুলগুলোকে কি যে সুন্দর লাগতো পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্নার  আলোয়। হঠাৎ বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে  গেলে ছুটে যেতাম বৃষ্টির সাথে তার অভিসার  দেখবার জন্য! এ এক অপার্থিব সৌন্দর্য! বলে বোঝাবার  মত নয়! অন্ধকারে পাতার উপর বৃষ্টির ফোটা মুক্তো দানার মত চিক চিক করতো। আমার বরকেও টেনে  নিয়ে যেতাম দেখাবার জন্য। আমার ভালোবাসার পাগলামি দেখে মুগ্ধ হতো সে! আদর করে ডাকতো আমায় ‘প্রকৃতি’ বলে। অসংখ্য ভিডিও, ছবি  ধারণ করেছি আমার মোবাইলে, একেক সময়ের একেক রূপ ধারণ করবার জন্য, বাসা ছেড়ে  কোথাও গেলেও যেন তাকে দেখতে পাই — সেই জন্য।এমনও অনেক বার হয়েছে আমার ছেলে কিংবা ওর বাবাকে  বলেছি কদম গাছটার ছবি কিংবা ভিডিও করে পাঠাতে আমার  অনুপস্হিতিতে। এক দুপুরে আমি ছাড়া বাসায় কেউ নেই। অলস সময় পার করছিলাম একটি বই হাতে।হঠাৎ হু হু করে কদমের সুরভি  মিশ্রিত এক পশলা বাতাস ঢুকে পড়ে  আমার ঘরে।একলা দুপুরের  নির্জনতা ভাঙে পাখির কিচিরমিচিরে। ঘর ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম।আমার মতই কেউ একজন এই বেলায় শুনছিল রবি ঠাকুরের গান। দূর থেকে ভেসে আসা রবীন্দ্রসংগীতের সুরে আবেশিত হয়ে গুন গুন করতে লাগলাম আমিও—
রৌদ্র-মাখানো অলস বেলায়   তরুমর্মরে ছায়ার খেলায় কী মূরতি তব নীল আকাশে   নয়নে উঠে গো আভাসি।                   হে সুদূর, আমি উদাসী।
বসে গেলাম খাতা কলম নিয়ে। কবিতাটির কিছু লাইন ছিল এমন—“ আমার অলস দুপুর এক চিলতে দখিনের বারান্দা   বারান্দার খুব লাগোয়া একটি কদম গাছ,   আমার একাকীত্ব্রের সঙ্গী।   যখন খুব একলা লাগে,   বারান্দায় দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাই,   গাছে থাকা দোয়েল,চড়ুই, টুনটুনি    কিচির মিচির করে সুর মেলায় আমারই সুরে,    জানান দেয়— তুমি আর একলা নও,   আমরাও আছি তোমার সাথে।”
কোন এক বর্ষণমুখর মধ্যরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। খুব বিরহ-কাতর মনে হলো বৃষ্টিভেজা কদম গাছটিকে। বসে গেলাম কবিতা লিখতে তাকে নিয়ে—
“বাদলও রাতে ঘুম ভেঙে যদি মনে পড়ে মোর কথাহাতটি বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিও তুমিএক ফোটা বৃষ্টির জল!বুঝে নিও সখা,বুঝে নিও তুমিএ তোমার সখীরও আঁখি-জল।”
এমনি করেই তার সাথে হাসি-আনন্দ, একাকীত্ব ভাগাভাগি করে বয়ে যাচ্ছিল আমার সময়। মাঝে-মধ্যেই শুনতাম— খুব শীঘ্রই বাড়ির কাজ ধরবেন ওনারা। কিন্তু তাতে আমি আর আগের মত ভড়কে যেতাম না। কারণ ইতোমধ্যেই যেহেতু আপারা জেনে গেছেন গাছটির জন্য আমার  প্রচন্ড ভালবাসার কথা, তাই যে কোনো ভাবেই তারা হয়তো গাছটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন — এমনই একটা বিশ্বাস ক্রমশ: দৃঢ়তর হচ্ছিল আমার মধ্যে। তাছাড়া আমারও বিশ্বাস ছিলো , গাছটি যেহেতু একদম দেয়াল ঘেষা তাই ওটাকে রেখেই  হয়তো বাড়ির  কাজ করা সম্ভব হবে। 
 হঠাৎ করেই একদিন দেখি জমিটার মাপ-ঝোক চলছে। দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই বললো—“যেহেতু ম্যাডাম  দেশে এসেছেন তাই সয়েল টেস্ট করিয়ে প্লান পাশ করে রাখবেন। পরে সুযোগ সুবিধা মতো বাড়ীর কাজ  ধরবেন।” চাচার ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই প্লটের যিনি অংশীদার তিনি আমেরিকায় থাকেন।আর দুটো প্লটের  মধ্যে বড় প্লটটিতে বাড়ি করে ইতোমধ্যে চাচার অন্য ছেলেমেয়েরা বরিশাল থেকে শিফট করে ঢাকায় বসবাস করতে শুরু করেছেন। কারণ সবার ছেলেমেয়েই ঢাকায় পড়াশুনা  করছে।  
ধুকপুক চলতেই থাকলো বুকের ভেতর। উত্তরোত্তর টেনশন বৃদ্ধি পাওয়ায় মিথ্যে সান্তনা দেই নিজেকে—প্লান পাশ করালেও বাড়ি এখানে কখনোই উঠবে না! বাড়ির কাজে অনেক ঝামেলা। সবাই ব্যস্ত। কে কার কাজ করে! যদিও আমি জানি যথেষ্ট জনবল রয়েছে ওনাদের এই কাজ সামলাবার জন্য। যে আপার বাড়ি হবে ওখানটায়, বাংলাদেশে বসবাসরত তার ছোটবোনের হাজবেন্ডই কনস্ট্রাকশন কাজের সাথে জড়িত। সুতারাং ওখানে কোনকালেই বাড়ি তৈরী হবে না এমন ধারণা পোষণ করা ছিল নিজের সাথে নিজেরই হাস্যকর প্রতারণা।
কেটে গেল আরো কয়েকটি বছর। আমি আর কদম গাছটি  হয়ে উঠলাম একে অন্যের অভিন্ন সত্তা। এক দুপুরে দেখি ট্রাকে করে আনা হয়েছে পাইলিং এর জিনিস পত্র।দৌঁডে  গেলাম নীচে। জিজ্ঞেস করতেই দারোয়ান বললো —বাড়ির কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমি আরও একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপাকে ফোন দিলাম। ঘটনা সত্যি। শুরু হতে যাচ্ছে  বাড়ির কাজ। কিন্তু কেন যেন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না গাছটির কথা। এড়িয়ে গেলাম ইচ্ছের প্রচন্ডতা উপেক্ষা  করে। তাছাড়া, আমার বিশ্বাস ছিলো আপা যেহেতু  সবই জানেন, তিনি গাছটিকে রক্ষা করবেন আমার কথা ভেবে। আমার বারান্দায় যাওয়া এবং গাছের দিকে সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখা বেড়ে গেলো। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলেও একবার উঁকি দিয়ে দেখে নেই—সে আছে তো! 
পরের দিন সকাল ১০টার দিকে বাইরে যাচ্ছি। সাথে আমার হাজবেন্ড। ওকে বললাম—জানো, কদম গাছের প্লটটিতে বাড়ির কাজ শুরু হয়েছে। বেশ নির্বিকার ও। আবারও বললাম —শুনছো, আপারা বাড়ির কাজ ধরেছেন। কোনরকম একটা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে প্রসংগ পাল্টাতে চাইলো। অনিচ্ছাকৃত একটা বকাও দিলো—তোমার সবকিছুতেই বেশি বাড়াবাড়ি। তাৎক্ষনিকভাবে ওর এই অপ্রাসংগিক কথাটার অর্থ বুঝিনি! আসলে যা কিছুই হোক, যাতে আমি পরিস্হতি মেনে নিতে পারি সেজন্য এটা ওর আগাম প্রচেষ্টা ছিলো। হঠাৎ বলেই ফেললো—গাছটা সম্ভবত আজ কেটে ফেলবে। আমি কিছু বলার ভাষা  হারিয়ে ফেললাম। শুধু বললাম—ফিরে এসে একটু দেখতে পাবো তো! বুঝে গিয়েছিলাম তাকে আর বাঁচাতে  পারবো না। তাই শেষবারের মত একটু দেখতে পারাটাও তখন আমার জন্য অনেক বড় কিছু। একবার ইচ্ছে হলো গাড়ি থেকে নেমে দু’দন্ড দাঁড়িয়ে যাই তার মায়াময় ছায়াতলে।ছুঁয়ে দেই তাকে শেষবারের মত । যদি ফিরে এসে না পাই! পরক্ষণেই ভাবলাম— না এতো তাড়াতাড়ি মনে হয় কাটবে না। কেবলই শুরু হলো কাজ। আরো একবার  প্রহসন নিজের সাথে নিজের। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গাড়ী চলে গেছে অনেকখানি দূরে।
বাসায় ফিরে আমি আর আমার ছেলে রাফিদ যথারীতি লাঞ্চ করছি।ছেলের বাবা তখনও ফেরেনি। মনে মনে ভাবছিলাম বাবুকে  খাইয়েই গাছটাকে একবার দেখে আসবো। রাফিদ, যেহেতু জানতো কদম গাছটির সঙ্গে আমার সখ্যতার কথা, তাই ধরা গলায় ওকেও বললাম—জানো বাবা, আজ মনে হয় কদম গাছটা কেটে ফেলবে। ও কিছুই বললো না। শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আঁচ করতে পেরেছিল মায়ের কষ্ট। ছোট বাচ্চা আমার! কিইবা করার আছে ওর! অনেকক্ষণ পরে বললো— বাবাকে জানিয়েছো।আমি বললাম—তোমার বাবাই তো আমাকে বললো।
পুরো বিল্ডিংয়ে যেহেতু আমরাই থাকি, তাই মেইন গেট ছাড়া সবার ফ্লাটের দরজাই বেশির ভাগ সময় খোলা থাকে। বাবুর খাওয়া শেষ হতেই আমি খাওয়া শুরু করবো এরই মধ্যে বড় ভাবী অর্থাৎ আমার বড় জা আমার নাম ধরে ডাকলেন। ছুটে গেলাম ভাতের প্লেট হাতেই। কেন ডেকেছেন জিজ্ঞেস করতেই ভাবী বললেন — জানো, কদম গাছটা কেটে ফেলেছে। প্লেটটা হাত থেকে পড়ে গেল।মানে?! কখন কেটেছে, আমাকে আর একটু আগে জানালেন না কেন — অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে করে ফেললাম ভাবীকে। ভাবী বললো —“আমি নিজেও জানতাম না। হঠাৎ বারান্দায় গিয়ে দেখি গাছটা কেটে ফেলা হয়েছে।” আমি নীচে যাবো না বারান্দায় যাবো বুঝতে পারলাম না।দৌড়ে চলে গেলাম বারান্দায়। গিয়ে দেখি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে আছে আমার অতি আদরের  কদম গাছ। ক্লান্ত ডালপালা গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদিক-সেদিক। সবুজ সতেজ পাতাগুলো কেমন কুঁকড়ে আছে! দেখতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তার এমন বিদায়।
 ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে কাঁদি। কিন্তু কেন যেন কাঁদতে  পারলাম না। প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে আরেকবার গেলাম বারান্দায়। গিয়ে দেখি ছোট ছোট টুকরো করে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে। কিছুই করার ছিলো না। শুধু নীরবে তার চলে যাওয়া দেখলাম। সাঙ্গ হলো আমাদের লুকোচুরি খেলা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোন ঋতুতেই আর ফিরে পাবো না তাকে।আমার অলস দুপুরে, একাকী বিকেলে, ভোরের আবছা-আলোয় কিংবা কোন বর্ষণমুখর সন্ধ্যা বা রাতে আর ছুটে যেতে হবে না তার কাছে।আমার খাঁ খাঁ বারান্দায় আমি আর এক আকাশ শুন্যতা।
আজ তার তিরোধানের দিন।কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই আমার। শুধু এটুকু বুঝেছি — ভুল অধিকারে ভালোবেসেছিলাম তাকে।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x