• শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

দেশীয় প্রযুক্তিতে গাড়ি তৈরি করে আকাশের বাজিমাত


ইউকেবিডি টাইমস ডেস্ক: স্বপ্ন ছিল নিজের তৈরি গাড়িতে চড়বেন আকাশ। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই স্বপ্ন বাস্তব করে দেখিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম লামাপাড়ার নবী হোসেনের ছেলে আকাশ আহমেদ। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে অবস্থিত অটোরিকশা ওয়ার্কশপে পুরোপুরি আকাশ নিজ হাতে তৈরি করেছেন ‘ল্যাম্বোরগিনির’ আদলে গাড়ি। এটি ঘণ্টা ৪৫ কিলোমিটার বেগে প্রায় ১০ ঘণ্টা চলতে সক্ষম।
আকাশ জানান, ছোটবেলায় প্রাইমারির গণ্ডি পেরুলেও হাইস্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি তিনি। জীবিকার তাগিদে তাকে কাজ করতে হয়েছে শিপইয়ার্ড ও রেললাইনের স্লিপার তৈরির কারখানায়। বাবা নবী হোসেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ফতুল্লার পশ্চিম লামাপাড়া এলাকায় মেসার্স নবী ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ নামের একটি অটোরিকশা তৈরির ওয়ার্কশপ দেওয়ার পর থেকে সেখানেই কাজ করতে থাকেন আকাশ।


আকশের গাড়ি তৈরির স্বপ্নের শুরু দেড় বছর আগে। অটোরিকশা নির্মাণের গ্যারেজ থেকে বডি তৈরি করতে করতে একসময় আকাশ বাবার কাছে প্রস্তাব দিলেন গাড়ি বানাবে সে। বাবা নবী হোসেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেকে অনুমতি দিলেন গাড়ি নির্মাণের। ক্যালেন্ডারের পাতায় ইতালির বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ল্যাম্বোরগিনি গাড়ির মডেল দেখেই সেটি অনুসরণ করে সামনে এগোতে থাকেন তিনি।বাবার কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে নিয়েই অল্প অল্প করে কাজ শুরু করেন। এরপর ইউটিউব থেকে টিউটরিয়াল অনুসরণ করেন। জাহাজ কাটার অভিজ্ঞতা থেকে ইস্পাতের পাত কেটে কেটে গাড়ির বডির শেপ তৈরি করা। ল্যাম্বোরগিনির আদলে গাড়ির নকশা প্রণয়ন। নির্মাণ, জোড়াতালি সবই তিনি তৈরি করেন নিজের হাতে। 
আকাশ জানান, গাড়ির চাকা আর স্টিয়ারিং হুইলটাই শুধু কিনে আনা হয়েছে। বাকি সব কিছুই নিজের হাতে তৈরি। চাকার সাসপেশন, হেডলাইট ব্যাকলাইট, গিয়ার, এসবও তিনি নিজের হাতে তৈরি করেছেন। প্রথমে তার ইচ্ছা ছিল গাড়িটিতে ফুয়েল কিংবা সিএনজির মাধ্যমে চালানো মেশিন স্থাপন করতে। কিন্তু এ বিষয়ে যারা অভিজ্ঞ তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, বাংলাদেশে এ ধরনের কাজের অনুমতি নেই। পরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মেশিন স্থাপন করেন। গাড়িতে প্রায় পাঁচটি ব্যাটারি লাগানো হয়েছে। যেটি প্রায় ১০ ঘণ্টা চলতে সক্ষম। আর এ ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ হতে লাগে ৫ ঘণ্টা। আর রাস্তায় নামলে গাড়িতে দুইজন আরোহীকে নিয়ে ঘণ্টা ৪৫ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারবে। তবে মেশিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার হলেও গাড়ির বডিটি সম্পূর্ণ ইঞ্জিনচালিত গাড়ির আদলে তৈরি। তবে এটা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রায় দেড় বছরের টানা প্রচেষ্টায় এটি পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে পরিণত হয়েছে। পুরো গাড়িটি এ অবস্থায় দাঁড় করাতে তার ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। তবে গাড়ির বডি কার্বন ফাইবারে করলে ৩ লাখ টাকাতেও বানানোও যাবে।
আকাশ আরও জানান, গাড়িটির দেড় বছরে প্রতিনিয়তই সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকটা অনুমাননির্ভর করেই পাড়ি দিতে হয়েছে অধিকাংশ পথ। কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই। আর সে কারণেই তিনি গাড়িটি তৈরি করতে পেরেছেন। আকাশ বলেন, ঈদের ছুটিতে গাড়িটি নামানোর পরই অসাধারণ সাড়া পেয়েছি। কেউ কেউ হিংসায় বাজে মন্তব্য করলেও তাতে পাত্তা দিইনি। নিজের তিল তিল করে গড়া পরিশ্রমে তৈরি করেছি এ গাড়িটি। তবে গাড়িটিতে আরও কিছু কাজ বাকি আছে। যেমন গাড়ির দরজাগুলো সুইচের মাধ্যমে অটো দরজা খুলবে ও বন্ধ হবে। 
আকাশের বাবা নবী হোসেন বলেন, আমার ছেলে এ গাড়ি বানিয়েছে। এটা এখনও এলাকার অনেকেই বিশ্বাস করতে চান না। অনেকেই এসে বিরক্ত করে ছেলেকে। সম্প্রতি একজন গাড়ি জোর করে চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে সামনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলেছেন। এরপর ছেলে দুই দিন কষ্টে কিছুই খায়নি। এখন নতুন করে গাড়ি খুলে সেটি মেরামত করতে হবে।গাড়িটি নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা জানতে চাইলে আকাশ জানান, আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করব, যাতে আমাকে গাড়িটি বাজারজাত করার অনুমতি দেওয়া হয়। 
অন্য কারও কাছে আমি এর নকশা বিক্রি করতে চাই না। শুধু অনুমতি দিলেই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া হবে। দেশীয় প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব এ গাড়িটি দেখে আমি আরও ২০টি গাড়ি তৈরির অর্ডার পেয়েছি। বাজারজাত করলে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকাতেই মানুষ পরিবেশবান্ধব এ গাড়িটি ব্যবহার করতে পারবেন। ব্যক্তিগতভাবে আরেকটি গাড়ি বানানোর ইচ্ছা আছে। তবে সেটির মডেল আপাতত অপ্রকাশিতই থাকুক। দেশের মানুষ যখন গুণীর কদর করতে জানবে, তখনি সেটি দেখতে পাবে।

Leave a Reply

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x