• সোমবার, মে ২০, ২০১৯

রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত সাধারণ মানুষ

Posted on by

রায়হান আহমেদ তপাদার

মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার আকাংখা পোষণ করে আসছে। কিন্তু উপরোক্ত উদাহরণগুলো বলছে শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মানুষের জীবন নিরাপদ নয় এবং অতীতেও যুদ্ধ, মহাযুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের কারণে এবং রাজনৈতিক সংকটে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে এবং এখনো মানুষের জীবন নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আছে। দেশে-দেশে, অঞ্চলে-অঞ্চলে রাজনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ, এটি অকাট্য সত্য যে, মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি কখনো। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সংঘাত-সংঘর্ষ যতোই বেড়ে চলেছে মানুষের জীবনযাত্রা ততই দুঃসহ এবং বিভীষিকাময় হয়ে ওঠছে। উদাহরণ হিসেবে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনী জনগণের দুঃসহ এবং অবর্ণনীয় দুঃখ বেদনার উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। যুদ্ধের কারণে, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জীবন বাঁচাতে ত্রিশ লাখের ও অধিক সিরিয়ান নাগরিক, নারী-পুরুষ, শিশু দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। একই অবস্থা আফগানিস্তানেও দেখা গেছে। যুদ্ধ এবং গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে দেশটি। ফলে দেশের জনগণের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন আফগান দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিশ্বের নানা দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। আদি কাল থেকেই এবং বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,গোষ্ঠীগত, ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো এবং এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ যুদ্ধে, গৃহযুদ্ধে তথা বহুমুখি দ্বন্দ্ব-সংকটে জড়িয়ে আছে বিধায় মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে এই পৃথিবী। 

আসলে যুদ্ধের ক্ষতি ভয়াবহ। এই ভয়াবহ সংকটে আক্রান্ত রাষ্ট্রের সংখ্যা শতাধিক। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা, সংঘাত, রাজনৈতিক সংকট ইত্যাদি কারণে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় এক ধরনের যুদ্ধমান পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে সারা পৃথিবী অশান্ত এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। যে কারণে, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ স্বপ্ন যেন অধরাই মনে করা হচ্ছে। 

মূলত: বিশ্বব্যবস্থা এখন শান্তির বিপরীতেই অবস্থান করছে। প্রতিবছর পৃথিবীতে সংঘাত, সংঘর্ষ, গৃহযুদ্ধ ও যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। জাতিতে-জাতিতে, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে যেমন যুদ্ধ চলছে, তেমনি গোষ্ঠীগত, দলীয়-উপদলীয় দ্বন্দ্ব সংঘাত ও ব্যাপক আকারে বেড়ে চলেছে। ২০১৯ সালের বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশা করেন না-এমন মানুষের দেখা পাওয়া সম্ভবত: অসম্ভব হবে। মূলত: সকল সাধারণ জনগণই নিরাপদ পৃথিবীর প্রত্যাশা করেন। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বব্যবস্থা এখন অস্থির, নিরাপত্তাহীন এবং যুদ্ধাক্রান্ত। আফগানিস্তানে গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ চলছে। দেশটিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ১৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিশ্লেষকরা আফগান যুদ্ধকে এন্ডলেস তথা সমাপ্তিহীন যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ চলছে। যদিও আমেরিকানরা সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিবে মর্মে ঘোষণা দিয়েছে, তথাপি যুদ্ধ যে শেষ হয়ে গেছে তেমনটি বলা যাচ্ছে না। কারণ যুদ্ধ এখনো কমবেশি চলছে এবং কবে যে সেখানে শান্তি ফিরে আসবে তা হলফ করে কেউ বলতে পারছে না। 

আরো একটি দীর্ঘ মেয়াদী অশান্তির অঞ্চল হলো ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যেকার সংকট ও যুদ্ধ। এখানে প্রতিনিয়তই যুদ্ধ চলছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। এটি মূলত: অসম যুদ্ধ। ইসরাইলের হাতে রয়েছে সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র, রয়েছে বৃহৎ শক্তি আমেরিকার সমর্থন। পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনীরা মূলত: নিরস্ত্র। ফলে প্রায় প্রতিদিনই নিরীহ ফিলিস্তিনীরা মারা পড়ছে ইসরাইলী সৈন্য ও পুলিশের ছোড়া গুলিতে। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত মানব জাতির জন্য সর্বকালেই বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক। যুদ্ধ, সংকট, গৃহযুদ্ধ মানব সম্প্রদায়ের পরবর্তী বংশধরদের অর্থাৎ শিশুদের ভবিষ্যত ধ্বংস করে দেয়। শিশুদের বেড়ে ওঠার সময়টায় জরুরি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ইত্যাদি যাবতীয় কিছুর ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে। শিশুদেরকেও দেশ থেকে দেশান্তরে পালিয়ে যেতে হয় একান্ত বাধ্য হয়ে। আবার উদ্বাস্তু ক্যাম্প গুলোতে জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবনও বিপর্যয়কর অবস্থায় পতিত হয়। উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নেওয়া নবজাতকরা জাতীয়তার পরিচয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। ফলে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রহীন জেনারেশন সৃষ্টি হচ্ছে। এই জেনারেশনের শিশুরা কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্বও জাতীয়তার পরিচয়ে পরিচিত হতে না পারার কারণে এদের ভবিষ্যত জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় পতিত হয়ে থাকে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত দপ্তরের মতে, এইসব শিশু-সন্তানদের প্রায় সকল প্রকার মৌলিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা বিদ্যমান রয়েছে। ঐ দপ্তরের মতে, সারা বিশ্বে বর্তমানে তিন মিলিয়নেরও অধিক রাষ্ট্রহীন শিশু রয়েছে-যাদের কোনো জাতীয়তা বা রাষ্ট্রের বাসিন্দা, নাগরিক ইত্যাদি পরিচয় নেই। 

এরা সবাই মূলত: উদ্বাস্তু শিশু। এদের কোনো ভবিষ্যত নেই।সামগ্রিকভাবে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, যুদ্ধ মানুষকে অবর্ণনীয় ধ্বংস ও বিপর্যয়কর এক দুঃখময় জীবনে ঠেলে দেয় এবং এর ফলে শিশুরা হয় সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত এবং তাদের ভবিষ্যত জীবন পড়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিপর্যয়কর ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে করুণ পরিণতির শিকার হয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরা বা জন্ম যাদের উদ্বাস্তু শিবিরে এদের জীবনের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। মিলিয়ন মিলিয়ন শিশু জাতীয়তার পরিচয় ছাড়াই বেড়ে ওঠতে থাকে। তাদের মনে এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে, ‘উই আর নো পিপল উইথ নো ন্যাশন। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সংঘাত-সংঘর্ষ শুধু যে মানবজাতির জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে তাই নয়, এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। এতে সম্পদের অপচয় ও ক্ষতি হয় হাজার হাজার মিলিয়ন ডলারের-যা বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাস-সংঘাত এবং অন্য রাষ্ট্রের হুমকি থেকে নিরাপদ থাকার নামে রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শুরু হয় অস্ত্র প্রতিযোগিতা। যে অর্থ দিয়ে মানুষের উন্নত জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি নিশ্চিত করার কথা, যে অর্থ দিয়ে মানুষের কল্যাণে অবকাঠামো ও অন্যান্য ক্ষেত্রের উন্নয়ন সাধন করার কথা, সে অর্থ দিয়ে উৎপাদন এবং বিপণন করা হচ্ছে মানব সন্তান হত্যার জন্য বিপজ্জনক মারণাস্ত্র। মারণাস্ত্র দিয়ে কেবল যে মানুষই হত্যা করা হচ্ছে তা নয় বরং তা দিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে ঘর-বাড়ি, সড়ক-রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সহ অবকাঠামোগত খাত।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র, সে ক্ষুদ্র হোক বা বৃহৎ রাষ্ট্রই হোক, মিলিয়ন, মিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করে চলেছে মারণাস্ত্র উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা খাতে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এসআইপি আরআই)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন, যেটি মে-২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো তা থেকে দেখা যায়, প্রতিরক্ষা ও মিলিটারী খাতে আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব, রাশিয়া এবং ভারত বিশ্বের মোট ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয়কারী রাষ্ট্র। পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রগুলো মোট ব্যয়ের ৬০% শতাংশই ব্যয় করছে ঐ পাঁচটি রাষ্ট্র।। গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো ২০১৭ সালে এ খাতে সর্বমোট ব্যয় করেছিলো ১.৭৩৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে এককভাবে সর্বাধিক ব্যয় করেছে আমেরিকা, যার পরিমাণ হলো ৬৯৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, চীনের ব্যয় হয়েছে ২২৮, সৌদি আরবের ৬৯, রাশিয়ার ৬৬ এবং ভারতের ৬৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সংঘাত-সংঘর্ষ মুক্ত পৃথিবী যদি গড়ে ওঠতো তাহলে অস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সামরিক ব্যয়ের এই বিরাট অংকের অর্থ মানব কল্যাণেই ব্যয় হতো, এমনটাই আশা করা যায়। কিন্তু পৃথিবীটা এখন সে জায়গায় নেই।পৃথিবীর সর্বত্র আজ অস্ত্রের ঝনঝনানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ। সমরাস্ত্র উৎপাদন,বিপণন এবং এগুলোর ব্যবহার নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দখল ও আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার কারণে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা কার্যত অশান্ত এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। দিকে দিকে যেন যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত অনিরাপদ এবং নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। 

পৃথিবী এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে-যার চূড়ান্ত পরিণতি ভয়াবহ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন উবে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। আর শান্তিপূর্ণ পৃথিবী না থাকার অর্থ হলো মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকার না থাকা।বিশ্বব্যবস্থা এখন গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ আর রাজনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা ও ক্ষতিকর প্রভাব গণমানুষের জীবনযাত্রাকে করে ফেলেছে ঝুকিপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞগণ এবং বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধরত থাকা, যুদ্ধের হুমকিতে থাকা এবং সশস্ত্র সংঘাত ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ক্রম প্রসারতা ও ব্যাপকতার দরুন বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা ক্রমাগত নিম্নমুখি, যা সমগ্র মানব সমাজকে ভয়ংকর এক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত হতে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাস, ভায়োলেন্স, অস্ত্রের ব্যবহার অধিক হারে বেড়ে চলেছে। ফলে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের আকাংখা তিরোহিত হচ্ছে এবং পৃথিবী ক্রমেই অস্থিতিশীল হচ্ছে। এমনকি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা সকল মহাদেশেই রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত ও বিপদগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

   লেখক ও কলামিস্ট 

raihan567@yahoo.com

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x