• বুধবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

কালের খেয়া- প্রচ্ছদ: চিঠিপত্রে আল মাহমুদ

Posted on by

আল মাহমুদকে লেখা চিঠি

জসীম উদ্‌দীনের লেখা

49, Narinda Road
    Dacca-7
    14.6.67

স্নেহের ভাই আল মামুদ।
দৈনিক পাকিস্তানে আমার উপর লেখা তোমার প্রবন্ধটি পড়ে বড়ই ভাল লাগল। এ ধরনের লেখা মস্তিস্ক দিয়ে হয় না।

শুধু হৃদয় দিয়েই লেখা যায়। আর ভাল লাগল এই বলে যে একজন অতি আধুনিক কবির কাছে আমার লেখাটি ভাল লেগেছে।

আমার যদি মতামত জিজ্ঞাসা কর, বলব, কাল সে আসবে কবিতাটির চেয়ে কাল সে আসিয়াছিল কবিতাটি বেশি ভাল। ওর মধ্যে আমি কিছু নতুন কথা বলেছি। কিন্তু তোমার ভাল লাগার বিষয়েই নয়- কারও ভাল লাগার উপরে প্রশ্ন করা যায় না।

তোমার ভাল লাগাটা পাঠকের মধ্যে সংক্রমিত করতে পেরেছ। এমনি আমার বহু কবিতা ভাল লাগে।

যেমন নজরুলের-

ব্যথার সাঁতার পাড়ি দেব,
…বালুচর
ওরে পাগল সেইখানে তুই
বাঁধলি আপন ঘর

ভাল লাগে। কিন্তু কেন ভাল লাগে বলতে পারব না। তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই সাথে পত্রে ইতি টানতে চাই। তার আগে আর একটি কথা তোমাকে বলব তোমার গদ্য লেখার বেশ ভাল ক্ষমতা। এদিকটা যদি আরও অনেকখানি প্রসারিত কর, তোমার কথা সত্য করে দেশের পাঠকদের বলতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গে যারা অতি আধুনিক কবিতা লেখেন তারা অনেকেই খুব ভাল গদ্য লিখছেন। বুদ্ধদেবের গদ্য অপূর্ব। অথচ আমাদের এখানে অতি আধুনিকেরা শুধু দল পাকিয়ে আর পূর্বসূরিদের দোষ ধরেই মনে করছে, তারা উপরে উঠছে। গদ্য কবিতা যারা লেখে তারাই ত ভাল গদ্য লিখবে। কিন্তু শামসুর রাহমানের গদ্য এমন ছেঁচড়িয়ে ছেঁচড়িয়ে চলে কেন?

তোমার প্রবন্ধের জন্য আবার তোমাকে ধন্যবাদ জানাই। একটা নতুন ভঙ্গিতে তুমি লেখাটি লিখেছ। উৎরে গেছে।

শুভার্থী
জসীম উদ্‌দীন


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা

প্রীতিভাজনেষু,
আপনার চিঠি পেয়েছি। আপনার চিঠিতে যে সমমর্মিতার সুর লেগেছে তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ঢাকা থেকে আপনাদের অনেকের লেখা পেয়েছি এবং অনেকের লেখাই আমাদের ভালো লেগেছে। ‘কৃত্তিবাস’ উভয় বঙ্গের সমস্ত তরুণ কবিদের মুখপত্র হোক- এই আমাদের কাম্য ছিল। আমরা কয়েকজন তরুণ মিলে অনেক কষ্টে ‘কৃত্তিবাস’ প্রকাশ করি- অর্থাভাবে মাঝে মাঝে প্রকাশ সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়তে হয়- কিন্তু আবার আপনাদের কাছ থেকে আশা, ভরসা পেয়ে নতুন প্রেরণা পাই। ‘কৃত্তিবাস’কে আপনি যে সাহায্য করলেন তা সামান্য হলেও তার মূল্য অনেক। কলকাতায় এলে নিশ্চয় দেখা করবেন। আগে চিঠি দেবেন। কৃত্তিবাসের পুরোনো সংখ্যা প্রায় নিঃশেষিত। তাই এক কপি করে পাঠালুম।

আপনাদের
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

২ 

প্রিয়বরেষু,
আজ এই সঙ্গে অনুসার পাঠালুম। ‘কৃত্তিবাস’ কেমন লাগলো জানাবেন। যদিও প্রুফের ভুল এবারে প্রচুর থেকে গেছে। কৃত্তিবাস সম্বন্ধে নতুন কিছু ওফবধ থাকলে জানাবেন। টাকা পয়সা কি করে নেবার ব্যবস্থা করা যায় সে সম্বন্ধে আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এখন একটু ব্যস্ত আছি- পরে বিস্তারিত চিঠি লিখবো। পত্রিকার প্রাপ্তি সংবাদ জানাবেন।

প্রীতি নেবেন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

অমিতাভ দাশগুপ্তের লেখা
কলকাতা-৩৭
বুধবার/৮.৩.৭২

প্রিয় আল মাহমুদ,
জানি এখন তুই ব্যস্ত। তোর কথা খুব শুনলাম নীরেন দা’র কাছে। তোর নাকি আসার সম্ভাবনা ছিল- কী হল?

২১ ফেব্রুয়ারির জন্য যে ভদ্রলোককে তুই আমার আর তরুণ সান্যালের পদ্য সংগ্রহ করতে পাঠিয়েছিলি, যে দিন আমরা লেখা দেব বলেছিলাম, সে দিন তিনি আসেন নি। অতঃপর আর আসেন-ই নি। 

তোর কথা প্রায়শ মনে হয়। মাঝে মাঝে খুব বেশি। তোর বই এখানে রীতিমতো বিক্রি হচ্ছে। এখানে আমিই প্রথম তোর বই রিভিউ করি ‘বেলা অবেলা’য়, কপি নিশ্চয়ই পেয়েছিস। আমার স্ত্রী তোর কথা খুবই বলেন। এককথায় তুই আমাকে গুণ করে রেখে চলে গিয়েছিস।

এই সঙ্গে গণকণ্ঠ-র ২৬ মার্চ সংখ্যার জন্য পদ্য পাঠালাম। আমার ঠিকানায় অন্তত ৫ কপি করে রবিবারের সংখ্যা পাঠাস। কি করছিস, বিস্তারিত জানাস। পত্রোত্তরে অতি অবশ্য গোটা দুয়েক পদ্য পাঠাস। পত্রপাঠ উত্তর দিস। সবাইকে প্রীতি জানাস। ভালোবাসা। 

তোর
অমিতাভ
১১.৩.৮৫

২.

প্রিয়বরেষু,
আশা করি, ভালোভাবে পৌঁছেচো এবং সপরিবারে ভালো আছো। এবার তোমার সঙ্গে ভালোভাবে কথাবার্তা হল না। খুব ইচ্ছে ছিল, একদিন আমার কুটিরে পা দেবে, একটু ডাল-ভাত খাবে, সে সাধ অপূর্ণ রয়ে গেল। তুমি জানো, ব্যক্তি ও কবি উভয় হিসেবেই তোমার প্রতি আমার স্পষ্ট পক্ষপাত আছে। কিন্তু কবিতা-উৎসবের আয়োজকদের তোলা পাঁচিল পেরিয়ে তোমাকে এবার খুব একটা ছুঁতে পারলাম না। তা ছাড়া (অবশ্যই তোমার কাছে নয়) আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তো থেকেই যায়। কারণ, যত ছোটই হই আমার বন্ধু ও শিক্ষকের নাম দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

একটি বিশেষ কারণে তোমাকে লিখছি। পশ্চিমবাংলার প্রধানতম প্রকাশক সংস্থা এখন দে’জ পাবলিশিং- তা তুমিও জানো। ওঁদের আমি অনুরোধ করেছি, অবিলম্বে তোমার একটি নতুন শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন প্রকাশ করতে। বলা বাহুল্য, ওঁরা সানন্দে রাজি হয়েছেন। আমি বলেছি, এ ব্যাপারে তোমার পক্ষে যাবতীয় যোগাযোগ ও দেখাশোনার দায়িত্ব আমি নেব। তাঁদের কথাতেই তোমাকে আমি এই চিঠি লিখছি।

তোমার আগেকার শ্রেষ্ঠ কবিতা, পরবর্তী গোটা তিনেক কাব্যগ্রন্থ ও কিছু বিচ্ছিন্ন কবিতা আমার কাছে আছে। তুমি যদি মনে করো, তা থেকেই একটি দশ ফর্মা-র বইয়ের ংপৎরঢ়ঃ আমি ওঁদের করে দিতে পারি। নচেৎ, তুমি যে-ভাবে ভালো মনে করবে, তাই হবে।

তাড়াতাড়ি বই-টি বার করতে চাই। কারণ শামসুর-এর বই প্রায় ছাপা হয়ে এসেছে। 

অবিলম্বে আমার ঠিকানায় তোমার বক্তব্য জানালে খুব খশি হব।

এখানে সবাই মোটামুটি। আমার স্ত্রী ও তোমার হিতাকাঙ্ক্ষিণী রত্না ভালো আছে। অনেক ভালোবাসা জেনো।

তোমাদের 
অমিতাভ
এ-২০ নেতাজী সমবায় আবাস
পো :প্রফুল্লকানন
কলকাতা-৫৯


সুধাংশু শেখর দে-র লেখা

Phome: 34-5035
Dey’s Publishing
Publishers & Book Sellers
13, Bankim Chatterjee Street,
Calcutta: 700073


শ্রী আল মাহমুদ
সমীপে,
মান্যবরেষু,
আমি আপনার শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশে আগ্রহী। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবার সুযোগ পেয়েও তা’ ব্যবহার করতে না পারার জন্যে আমার নিজেরও ক্ষোভ বা আক্ষেপ রয়ে গেছে।

যা হোক শ্রদ্ধেয় অমিতাভ দাশগুপ্তকে আমার আগ্রহ প্রকাশ করায় তিনি সানন্দে আপনার সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব নেওয়ায় আমিও নীরব ছিলাম। অমিতদাকে লেখা আপনার চিঠি থেকে সমস্ত জানলাম।

দশ ফর্মার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবিতার জন্য কবিতা নির্বাচনের দায়িত্ব অমিতদা সানন্দে পালন করবেন, জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর কাছে ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ ছাড়া আর কোনও সাম্প্রতিক কবিতার বই নেই। বইগুলি তাঁর দরকার। তিনিও আপনাকে চিঠি দেবেন।

আশা করি কুশলে আছেন। আপনার সম্মতিপত্রের অপেক্ষায় থাকলাম।

সশ্রদ্ধ নমস্কারান্তে

বিনীত
সুধাংশু শেখর দে

আল মাহমুদের লেখা চিঠি জসীম উদ্‌দীনকে

শ্রদ্ধাস্পদেষু,
আমার সালাম জানবেন। অপ্রত্যাশিত আপনার চিঠি পেয়ে আনন্দ ও গর্ব অনুভব করলাম। আপনার ওপর লেখা আমার সামান্য রচনাটি যে এভাবে সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ভাবতে পারিনি। আপনার ওপর একটি প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আমার অনেক দিন যাবৎই ছিল, কিন্তু কোনোদিন সাহস করে লেখা হয়ে ওঠেনি। ভয় ছিল আমি ঠিকমতো আমার বক্তব্য পেশ করতে সক্ষম হবো না ভেবে। যা হোক লেখাটি অনেক পাঠককে আনন্দ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, আপনারও ভালোবাসা অর্জন করতে পারলাম, আমার কাছে এটাই বড় কথা। 

আপনার চিঠির জবাব অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ অসুখে আমি শয্যাগত হয়ে পড়ায় হয়ে উঠল না। আর ভালো হয়ে শুনলাম আপনি রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। তখন তাড়াহুড়ো করে আর লিখলাম না। যা হোক আপনি ফিরে এসেছেন শুনে এই চিঠি লিখছি। আশা করি আপনার মস্কো সফর আনন্দদায়কই হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে ভারি ইচ্ছে হচ্ছে। ঢাকায় গেলে একদিন আপনার বাসায় বসে এ নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল। 

ইতিমধ্যে বাজারে দেখলাম জনৈক অধ্যাপক আপনার ওপর একটা প্রকাণ্ড বই লিখেছেন। বইটি বিপণী বিতানে আমাদের বইয়ের দোকানে দেখলাম। গ্রন্থখানি এখনও আমার পড়া হয়নি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বইটি পড়ে ফেলার ইচ্ছা রাখি। কারণ আমারও এমন একটি ভাবনা আছে যে, ১৫০ পৃষ্ঠার ভিতর আপনার ওপর একটি ছোটোখাটো রচনা তৈরি করবো। যদি প্রকাশক পাওয়া যায় তবে অনতিবিলম্বেই কাজে হাত দেওয়ার বাসনা রাখি। এ ব্যাপারে আপনি আমাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও উপদেশ দান করবেন বলে বিশ্বাস আছে। আমার গদ্য আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হয়েছি। এ দিকটা প্রসারিত করার জন্য আপনার উপদেশ আমাকে দারুণভাবে প্রাণিত করেছে। আমারও বিশ্বাস, আমরা যারা শুধু কবিতা নিয়ে আছি তারা অল্পাধিক গদ্য রচনা করলে এদেশের গদ্য সাহিত্যের এমন দুর্গতি হতো না। অন্তত প্রত্যেক কবি একটি বা দুটি উপন্যাস অথবা প্রবন্ধ বই রচনা করলে আমাদের সাহিত্যের চেহারা পাল্টে যেতো। অধ্যাপকদের জুলুমের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে কবিদেরই এগিয়ে আসা উচিত। একথা একদিন আমি শামসুর রাহমানকেও বলেছিলাম। 

আপনার ওপর আমি যে বইটি লেখার আশা রাখি তার মোটামুটি একটা পরিকল্পনা আমার মনের মধ্যে আছে। আমার বিশ্বাস কবিতার ওপর তথ্যগত আলোচনা পাঠকেরা খুব বেশি পছন্দ করে না। আমি শুধু আপনার কবিতার সৌন্দর্যটা কোথায় লুকিয়ে আছে এ নিয়ে বক্তব্য পেশ করবো। এ করতে গেলেও তথ্য এবং সময়জ্ঞান থাকা একান্ত দরকার। আমার সাধ্যমতো আমি প্রস্তুতও হচ্ছি। তবু আপনার সাহায্য আমার দরকার হবে। অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আপনাকে জ্বালাতন করতে হবে বলে ভয় পাচ্ছি। আশা করি এ জন্যে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। 

এ সময় ঢাকা থাকলে খুব ভালো হতো। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এখানে আসতে হলো। ঢাকায় থাকার খুব চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু হলো না। আবার যদি চলার মতো সামান্য একটা চাকরি জুটে যেতো ঢাকায় ফিরে আসতাম। যা হোক, এখান থেকেও যাতে বইটা লিখতে পারি তার চেষ্টা করছি। 

আল মাহমুদ
আগস্ট ১৯৬৭

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x