• সোমবার, মে ২০, ২০১৯

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দলের জয়জয়কার টি-টোয়েন্টি, ওডিআই, টেস্টে সফরকারী ইংল্যান্ডের পরাজয়

Posted on by

আবু মুসা হাসান:


বাংলাদেশ সফররত অনূর্ধ্ব ১৯ ইংল্যান্ড দলকে জয়ের স্বাদ নিতেই দিলোনা বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সফরের শুরুতে একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অনূর্ধ্ব ১৯ বাংলাদেশ দল সাত উইকেটে জয়লাভ করে। তিন ম্যাচের এক দিনের আন্তর্জাতিক বা ওডিআই সিরিজেও তাদের প্রতিপক্ষ অনূর্ধ্ব ইংল্যান্ড দলকে হোয়াইটওয়াশ করলো বাংলাদেশ। আর সবশেষে দুই ম্যাচের যুব টেস্ট সিরিজেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট দল সফরকারীদের হোয়াইটওয়াশ করে নিরংকুশ বিজয় নিশ্চিত করছে।

টেস্ট সিরিজেও বাংলাদেশের জয়-জয়কার
৭ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম টেষ্টে সাত উইকেটে জয়লাভ করে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দল তাঁতিয়ে ছিল দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে জয়লাভ করার জন্য। প্রথম যুব টেস্টে বোলার মিনহাজুর রহমান দুই ইনিংসে ৭৫ রান দিয়ে মোট ৯টি উইকেট লাভ করে প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন।
আর একই স্টেডিয়ামে ১৫ থেকে ১৮ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচের জয়ের মূল নায়ক হচ্ছেন মাহমুদুল হাসান জয়। অনূর্ধ্ব ১৯ ইংল্যান্ড দল একর পর এক ম্যাচ হেরে সফরের শেষ ম্যাচে, অর্থাৎ দ্বিতীয় টেস্টে জয়লাভে করার জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই চালিয়েছিল। ফলে শেষ টেস্টে চালকের আসনেই ছিল ইংল্যান্ড দল। চারদিনের টেষ্টের প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ৩৩৭ রানের জবাবে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২২৮ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ড আট উইকেটে ২২৩ রান করে মোট ৩৩২ রানের লীড নিয়ে ডিক্লেয়ার দিয়েছিল জয়ের আশায়। কারন, টেস্ট ম্যাচের শেষ ইনিংসে একদিনে ৩৩২ রানের টার্গেট ছুঁয়ে জয়লাভ করাটা যেকোন দলের জন্যই এক কঠিন ব্যাপার। কিন্তু সেই ‘অসম্ভবকেই‘ সম্ভব করলো তরুণ ক্রিকেটার মাহমুদুল হাসান জয়ের ব্যাট। প্রথম ইনিংসে সর্বোচ্চ ৭৪ রানের অধিকারী জয় দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৪ রানের সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন। সাথে পার্টনার হিসেবে পেয়েছিলেন তৌহিদ হৃদয়কে। ৭৬ রান করে হৃদয় আউট হয়ে গেলে তাদের ১২১ রানের পার্টনারশীপের অবসান ঘটে।
মাহমুদল হাসান জয় নির্বাচিত হন প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ। আর বল হাতে দুই টেস্টে ১৬ টি উইকেট শিকার করে মিনহাজুর রহমান মোহনা নির্বাচিত হন প্লেয়ার অফ দ্যা টেস্ট সিরিজ।
ওডিআই সিরিজ
এর আগে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দল কক্সবাজারের শেখ কামাল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত তিন-ম্যাচের ওডিআই সিরিজেও অনূর্ধ্ব ইংল্যান্ড দলকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল। ২৯ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত প্রথম ওডিআই ম্যাচে সাত উইকেটে ইংল্যান্ডের ২০৯ রানের জবাবে হাতে ২৬ বল বাকী থাকতেই পাঁচ উইকেটে ২১০ রান করে অনূর্ধ্ব ১৯ বাংলাদেশ দল অনায়াসেই পাঁচ উইকেটে জয়লাভ করে। পারভেজ হোসেইন ঈমন ১২১ বলে ৮০ রান করে মনোনীত হন ম্যান অফ দ্যা প্লেয়ার।
৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওডিআই ম্যাচে সাত উইকেটে অনূর্ধ্ব ইংল্যান্ডের ২৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দল ১৩ বল বাকী থাকতেই ২৫৮ রান করে পাঁচ উইকেটে জয়লাভ করে। ৪৬ বলে ৭০ রান করে প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন তানজিদ হাসান তামিম।
তৃতীয় এবং শেষ ওডিআই ম্যাচে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দলের নয় উইকেটে ২৬৬ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে অনূর্ধ্ব ইংল্যান্ড দল ২০৩ রানে গুটিয়ে যায়। বাংলাদেশ দল জয়লাভ করে ৬৩ রানে এবং ৮৭ বলে ৭২ রান করে প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন শামীম হোসেইন।
অন্যদিকে একটি ১১৫ রানের সেঞ্চুরী সহ তিন ম্যাচের ওডিআই সিরিজে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহ করায় প্লেয়ার অফ দ্যা সিরিজ নির্বাচিত হন অনূর্ধ্ব ইংল্যান্ড দলের বেন চার্লসওয়ার্থ।

টি-টোয়েন্টি ম্যাচ
অনূর্ধ্ব ১৯ ইংল্যান্ড দল ২৭ জানুয়ারী কক্সবাজারের শেখ কামাল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ দলের মুখোমুখি হয়েছিল সফরের একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার জন্য।
তানজিম হাসান সাকিবের দূর্দান্ত বোলিং এর ফলে সফরকারীদের ইনিংস মাত্র ১২০ রানে গুটিয়ে যায়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা হাতে সাত বল বাকী থাকতেই মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ১২৩ রান করে সাত উইকেটে একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি জয়লাভ করে। ৩০ রানে চার উইকেট শিকার করে প্লেয়ার অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন তানজিম হাসান সাকিব।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বিপর্যয়
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের এই সাফল্যের বিপরীতে জাতীয় ক্রিকেট দলের নিউজিল্যান্ড সফরে একের পর এক বিপর্যয় টাইগার সমর্থকদের ভাবিয়ে তুলেছে। নিজ দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড দল সব সময় ভালো খেলে থাকে এবং বাংলাদেশ কখনও নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে ওডিআই ম্যাচ জয়লাভ করতে পারেনি। কিন্ত তা বলে কি বাংলাদেশ দল এভাবে একর পর এক আত্মসমর্পণ করবে? নিউজিল্যান্ডের পেস বোলার যুগল ট্রেন্ট বোল্ট এবং টীম সৌদীকে যদি বাংলাদেশ দলের তরুণ ক্রিকেটার মোহাম্মদ মিঠুন মোকাবেলা করতে পারেন, যদি সাব্বির রহমান সেঞ্চুরী হাঁকাতে পারেন, তাহলে টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডারের তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকার, লীটন দাস এবং মাহমুদউল্লাহ প্রমুখ অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান কেন দাঁড়াতেই পারবেনা? ইনজুরীর জন্য শেষ ম্যাচে মিঠুন খেলতে পারেনি। মিঠুন প্রথম ওডিআইতে ৬২ রান এবং দ্বিতীয় ওডিআইতে ৫৭ রান করেছিলেন।
প্রথম দুই ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশ কোন প্রতিযোগিতা না করেই হারার পর মনে একটা ক্ষীণ আশার সৃষ্টি হয়েছিল যে তৃতীয় ও শেষ ওডিআইতে জয়লাভ করে বাংলাদেশ ধবল ধোলাই হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। মঙ্গলবার ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী লন্ডন সময় রাত ১০টায় ম্যাচটি শুরু হলে তেমন ইংগিতই পাওয়া গিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের প্রথম দুই ম্যাচ জয়ের নায়ক ওপেনার মাটিন গাপটিলকে ২৯ রানের মাথায় বাউন্ডারী লাইনে দূর্দান্ত ক্যাচ নিয়ে তামিম আউট করার পর বাংলাদেশের জয়ের ব্যাপারে অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মার্টিন গাপটিল প্রথম ওডিআইতে ১১৭ রানের অপরাজিত ছিলেন। দ্বিতীয় ওডিআইতেও গাপটিল সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন এবং ১১৮ রান করে আউট হয়েছেন।

ইজ্জত রক্ষা করেছেন সাব্বির
কিন্তু না, অতি দ্রুতই স্বপ্নভংগ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে উইকেটের পতন ঘটলেও নিউজিল্যান্ডের রানের চাকা থেমে থাকেনি। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে (বিপিএল) বিভিন্ন দলে বিশ্বসেরা ক্রিকেটারা অংশ নিয়েছিলেন। বিপিএল এর ১০ জন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় আট জনই বাংলাদেশের বোলার। শুধু তাই নয়, এই তালিকার প্রথম পাঁচজন বোলারই বাংলাদেশের। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সফরে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের বোলারদের বলে কোন ধারই নেই। টি-টোয়েন্টি এবং ওডিআইতে কম রান দেয়া বোলার হিসেবে স্বীকৃত মুস্তাফিজুর রহমানও গতকালের ম্যাচে রান দেয়ার ব্যাপারে খুবই উদার ছিলেন। মুস্তাফিজ দুটি উইকেট নিলেও ১০ ওভারে দিয়েছেন ৯৩ রান। আর ৫০ ওভারে ছয় উইকেট খুইয়ে নিউজিল্যান্ড সংগ্রহ করলো ৩৩০ রান।
নিউজিল্যান্ডের বোলারদের মোকাবেলা করে এই বিশাল রানের টার্গেট টপকে জয়লাভ করা যে সম্ভব হবে না, তা সহজেই আঁচ করা গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের টপ অর্ডার যে খেলতেই পারবেনা, তা কিন্তু কেউ ভাবেনি। ওডিআইতে সব দলই চেষ্টা করে প্রথম ১০ওভারের পাওয়ার প্লেতে হাত খুলে ব্যাট চালিয়ে বড় অংকের রান সংগ্রহ করতে। প্রথম পাওয়ার প্লেতে নিউজিল্যান্ড এক উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করেছিল ৫২ রান। কিন্তু বাংলাদেশের টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা কি করলো? বলের সাথে ব্যাটের সংযোগই ঘটাতে পারিছিলনা। অধিকন্তু, দ্বিতীয় বলেই দলীয় শূন্য রানে তামিম স্লিপে ক্যাঁচ তুলে দিলেন উইকেট কিপারের হাতে । এরপর রানের খাতা না খুলেই সৌম্য সরকার আউট হলেন। তার সাথে সাথেই দলীয় দুই রানের মাথায় লীটন দাসও আউট হয়ে গেলেন। তিন উইকেট হারানোর পর মুশফিকুর রহিম নেমে ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার মিছিল বন্ধ করতে সক্ষম হলেও নয় দশমিক পাঁচ ওভারে ব্যাক্তিগত ১৭ রান এবং দলীয় ৪০ রানের মাথায় আউট হয়ে গেলেন। এরপর ব্যাক্তিগত ১৬ রান এবং দলীয় ৬১ রানের সময় মাহমুদউল্লাহও আউট হয়ে যান। কিন্তু দৃঢ়তার সাথে ব্যাটিং করে ১২টি বাউন্ডারী এবং দুটি ওভার বাউন্ডারী মেরে সাব্বির রহমান সেঞ্চুরী করতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত সাব্বিরের ১০২ রান, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের ৪৪ রান এবং মেহেদেী হাসান মিরাজের ৩৭ রানের ওপর ভর করে ৪৭ দশমিক দুই ওভারে বাংলাদেশ ২২৪ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। সাব্বিরও যদি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মতোই আসা-যাওয়ার মিছিলে যোগ দিতেন তাহলে বাংলাদেশ দলের কি পরিণতি হতো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
উল্লেখ্য, এই সফরে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের সাথে তিনটি টেস্ট ম্যাচও খেলবে। প্রথম টেস্টটি ২৭ ফেব্রুয়ারী লন্ডন সময় রাত ১০টায় শুরু হবে।

আবু মুসা হাসান. সাংবাদিক ও কলামিস্ট
লন্ডন ২০ ফেব্রুুয়ারী, ২০১৯

Leave a Reply

More News from খেলাধূলা

More News

Developed by: TechLoge

x