• বুধবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

শিক্ষার্থীদের উপর মানসিকভাবে অত্যাচার বন্ধ করা প্রয়োজন

Posted on by

দেশের অবস্থা আজ ভীষণ খারাপ। অথচ সরকার উন্নয়নের বুলিতে মুখে ফেনা তুলছে। সরকারের কথা শুনে দেশের মানুষ এখন হাসে। দেশবাসী খুব ভালো করে জেনে গেছে- ভোটারবিহীন বর্তমান মহাজোট সরকার দেশে মহালুট চালাচ্ছে।’ কোটার সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে অত্যাচার চালানো হচ্ছে তা পাকিস্তান আমলের নিপীড়নকেও ছাড়িয়ে গেছে, ‘তারা সংস্কার চেয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা বাতিল করে দিলেন। আবার বলছেন কোটা থাকবে। এখন তাদের ওপরে আপনার গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। তারা যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন করেছে পাকিস্তান আমলেও এভাবে নির্যাতন করা হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে বলতে চাই কোন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেন একদিনের জন্যও নষ্ট না হয়। তাদেরকে মানসিকভাবে অত্যাচার করা না হয়। সেই দিক খেয়াল রাখতে হবে । কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবী নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের যৌক্তিক দাবীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোও গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন। এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিল ঘোষণা করেন, আন্দোলনকারীদের যদিও দাবী ছিল সংস্কারের, বাতিলের নয়। তথাপি তারা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতি আস্থা জানিয়ে আন্দোলন স্থগিত রেখেছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ প্রায় আড়াই মাস অতিবাহিত হলেও সরকারের তরফ থেকে কোন প্রকার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় সৃষ্টি হয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। ক্ষমতার দাপটে ছাত্রলীগ এতটাই বেসামাল যে কোনটা যৌক্তিক দাবি আর কোনটা অযৌক্তিক দাবি তাও অনুধাবন করতে পারছে না। পত্রিকার পাতায় যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দৃশ্য দেখেছি তখন মনের অজান্তেই বিশ্বজিৎতের কথা মনে পড়ে গেল। বিশ্বজিৎতকে যেভাবে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ঠিক একই কায়দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। বিশ্বৎজিত হয়তো বেঁচে থাকলে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বলতেন, ভাই কোটার দরকার নেই, আগে জীবন বাঁচান। গত ১৭ ফেব্রæয়ারি থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী আন্দোলন করে আসছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করে আন্দোলকারীরা। গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সব কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। আন্দোলনকারীরা এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিল করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রজ্ঞাপন অদ্যাবধি জারি হয়নি। প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ডাকে সারাদেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলছিল। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রায় তিন মাস পার হলেও প্রজ্ঞাপন জারি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য ৩০ জুন শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে সাংবাদিক সম্মেলন শুরুর আগেই ছাত্রলীগ তাদের উপর নির্মম-নিষ্ঠুর হামলা চালায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই সমাজ ও রাষ্ট্রে হাজারো অন্যায়-অবিচার-জুলুম চললেও কেউ টু-শব্দ করতে পারবে না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা সামান্য একটা সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি কেন নিল এই অপরাধে তাদের উপর হামলা করা হয়েছে। এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেয় পুলিশ। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যে অত্যাচার চলছে, তাতে আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার মাথা নত হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, এজন্য কী মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, কথা বলার অধিকার নাই। এ লজ্জা রাখবো কোথায়! দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়েছে এটা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। কোটাবিরোধীদের ওপর ছাত্রলীগের এ ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুর হামলা বেদনাদায়ক। সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, কাউকে মাটিতে ফেলে লাথি মারা কোনো সভ্য মানুষের কাজ নয়! ছাত্রলীগের হামলাকারীদের হাত থেকে ছাত্রীরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্পীকার নারী সেই দেশে একজন নারীকে ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে রাজপথে পিটিয়ে আহত করলেও নারীবাদী সংগঠনের নেত্রীরা টু-শব্দ পর্যন্ত করেনি। এমনকি মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও টিআইবির কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। নারীর জীবন ও ইজ্জত লুণ্ঠনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই থাকুক তারা কোন সভ্য সমাজের মানুষ হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধনী-গরিব বা সাদা-কালো নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু কোনো একটি গোষ্ঠীর জন্য শুধুমাত্র অধিকার সংরক্ষন করা হলে সামাজিক বৈষ্যম বাড়বে। ছেলেমেয়েরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার সম্পত্তি পেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলেমেয়েই অন্যান্য ছেলেমেয়ের মতোই সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য। এই অধিকার প্রয়োগে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী বাছবিচারের বিষয় হতে পারে না। মেধাবীদেরকে বঞ্চিত করে পৃথিবীর কোনো দেশই উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারেনি এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অন্যায়ের প্রশয় দিয়ে ক্ষমতাসীনরা বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি।

 

আকলিমা ইসলাম

মানবিধীকারকর্মী ,ভয়েস ফর বাংলাদেশ

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x