• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১, ২০১৯

সুযোগ পেয়েও অর্থের অভাবে ঢাবিতে ভর্তি হতে পারছে না মেধাবী জেরিন

Posted on by

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা জীবন নিয়ে শঙ্কিত গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের অদম্য মেধাবী জেরিন খাতুন। জেরিনের ভর্তি ও পরবর্তীতে পড়ালেখার খরচ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তার ছাপ এখন দরিদ্র বার-মার চোখে মুখে। কীভাবে ভর্তি হবে, কীভাবে মেসে থাকবে আর কীভাবে পড়ালেখার খরচ জুটবে জেরিনের! এসব নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেরিনের পরিবার।

জেরিন এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিট থেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফলাফলে মেধাক্রমে ৮৭৫ পেয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। ফরম পুরণের টাকাও সংগ্রহ করতে পারেনি জেরিন। পরে স্কুলের প্রিন্সিপাল শাহাফুল ইসলাম শোভনের সহযোগিতায় একটি মাত্র ফরম তোলেন জেরিন।

আগামী ২১ অক্টোবর ‘খ’ ইউনিটে মৌখিক পরীক্ষা আছে জেরিনের। এবছর এইচএসসির ফলাফলে মানবিক বিভাগে এ প্লাস পায় জেরিন। ফলাফলে ১০৯০ সর্ব্বোচ নম্বর পেয়ে জেলার মধ্যে এবার প্রথম হয় জেরিন।

দরিদ্র ও শত প্রতিকুলতা জয় করা মেধাবী জেরিন খাতুন গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের বদলাগাড়ী গ্রামের জহুরুল ইসলামের মেয়ে। জেরিনের বাবা জহুরুল ইসলাম দিনমজুর ও মা নুরবানু গৃহিনী। সামান্য আয়ে চারজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেত হয় জহুরুলকে। ছোট মেয়ে লিজা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে স্থানীয় জিনিয়াস কিন্ডার গার্টেন স্কুল এন্ড কলেজে।বুধবার (১৭ অক্টোবর) রাতে জেরিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে দুইবোন ও বাবা-মার বসবাস। ভবিষ্যতের কথা জানতে চাইলে মাসহ জেরিন লুকানোর চেষ্টা করে চাপা কান্না।

জেরিনের বাবা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘বছর তিনেক আগেও গ্রাম ঘুরে চানাচুর বিক্রি করেছি। বাড়িভিটে আর ২০ শতক জমি তার সম্বল। দুই মেয়ে লেখাপড়া করায় লোকলজ্জায় চানাচুর বিক্রি ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করি। কখনো কৃষি জমিতে কখনো ইটভাটায় কাজ করি। আর কাজ না পেলে সংসার চলেনা, খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। ধারদেনা করে চিকিৎসা চলে। তার পক্ষে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো অসম্ভব। তার পড়াশুনার খরচ যোগানোও তার পক্ষে সম্ভব নয়। জেরিন অত্যন্ত মেধাবী, তাই সমাজের বিত্তবান কেউ যদি ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ বহণে হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে জেরিনের স্বপ্ন পুরণ হবে’।

জেরিনের মা নুরবানু বেগম বলেন, ‘স্বামীর আয়ে কোন রকম সংসার চলে। দু:খ, কষ্টে দুই মেয়ে লেখাপড়া করছে। বড় মেয়ে ভালো ফলাফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এ আনন্দে বুক ভরে যায়। কিন্তু আনন্দ নেই তাদের। জেরিনের ভর্তি, আবাসিক ব্যবস্থা ও অন্যান্য যে সকল খরচ লাগবে তা কিভাবে বহন করবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। বাড়ি থেকে পড়ালেখার সময় যে খরচ হতো তা শিক্ষকরা দিতো। কিন্তু যদি থাকার জায়গা (হল) না পায় তাহলে ঢাকাতে বাসা, মেসে থাকা, খাওয়া ও পড়াশুনার খরচ জুটবে কি করে। কে করবে সহযোগিতা, কে নিবে তার দায়িত্ব?

জেরিন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কলেজ ও স্কুলের স্যারদের সহযোগিতা পেয়েছি। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছি। কিন্তু সীমাহীন দারিদ্র্যতাই এখন উচ্চশিক্ষা নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে টিউশনি করে হলেও আমি পড়তে চাই। ইংরেজি ও আইন বিষয়ে পড়ে ম্যাজিস্ট্রেট বা শিক্ষকতা করার ইচ্ছে জেরিনের। এজন্য সকলের দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন জেরিন’।

জেরিনের বাড়িতে কথা হয় জিনিয়াস ক্যাম্পাস স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল মো. শাহাফুল ইসলাম শোভনের সাথে। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী জেরিন। জেরিনকে সব সময় শিক্ষকরা সহযোগিতা করেছে। দারিদ্রতা ও প্রতিকূলতায় জেরিনের ফলাফল অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য দৃষ্টান্তমুলক। তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়নি, টাকা ছাড়াই কোচিং করেছে জেরিন। বাবা-মা দরিদ্র হওয়ায় জেরিনকে বইসহ শিক্ষা উপকরণ, ভর্তি ও পরীক্ষার ফরম পুরণে সহায়তা করেছি। চেষ্টা করেও জেরিনের বৃত্তির ব্যবস্থা হয়নি, সহযোগিতায় এগিয়েও আসেনি কেউ। বাড়িতে মাঝে মাঝে টিউশনি করে জেরিন। জেরিনের পাশে থেকে সবসময় সাহস-উৎসাহ, পরামর্শ ও অর্থ দিয়েও সহযোগিতা করেছি। জেরিনের মতো সমাজের অনেক দরিদ্র, অসহায় মেধাবীদের পাশে আমাদের প্রত্যেকের দাঁড়ানো দরকার।

২০১৩ সালে স্থানীয় ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসিতে অংশ নিয়ে এ প্লাস পায় জেরিন। ২০১৬ সালে একই বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকেও এ প্লাস পায়। এরপর ২০১৮ এইচএসসিতে সাদুল্যাপুর ডিগ্রী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এ প্লাস অর্জন করে জেরিন। পড়াশুনার খরচ কমাতে এইচএসসিতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয় জেরিন।

জেরিনের উচ্চ শিক্ষায় সমাজের বিত্তবানদের সহায়তার কামনা করেছে জেরিনের পরিবার। অর্থ সহায়তা পেলে জেরিন তার স্বপ্ন পুরণ করতে পারবে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের। জেরিনের পাশে দাঁড়াতে বা সহযোগিতা করতে চাইলে জেরিনের বাবা ০১৭৪২২৩৪৭২৩ ও শিক্ষক ০১৭২৭৯৮৪১২৩ এবং ০১৭৯৩৮০০৩৮৩ নাম্বারে যে কেউ যোগযোগ করতে পারবেন।

Leave a Reply

More News from অর্থনীতি

More News

Developed by: TechLoge

x