• শুক্রবার, অক্টোবর ৩০, ২০২০

নির্দোষ লুতফুর রহমান বিশুদ্ধ হতে পারবেন কি ?

Posted on by

ব্রিটেনকে বলা হয়ে থাকে  তৃতীয় বাংলা। বিশেষ করে লন্ডনের পূর্ব এলাকা যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। জাহাজের খালাসি হয়ে এসেছিলেন আমাদের পূর্ব প্রজন্ম। বর্ণবাদ, নিজেদের শিক্ষার সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ব্রিটেনে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম  পর্যন্ত বাংলায় করতে পেরেছিলেন। তাঁদের উত্তর প্রজন্মের হাত ধরেই বাংলা টাউন, আলতাব আলী পার্ক, শহীদ মিনার গড়ে উঠেছে। তৃতীয় প্রজন্মে এসে শিক্ষায় দীক্ষায় ব্রিটেনের মূল ধারায় নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন তাঁদের। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সাল বিলেতের বাঙালিদের জন্য এক ঐতিহাসিক বছর ছিল।লেবার পার্টি থেকে  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন রুশনারা আলী। বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলে, সেই লেবার পার্টিকে চ্যালেঞ্জ করেই প্রথম নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন লুতফুর রহমান।

  • লুৎফর রহমান

কিন্তু সেই অভিযান খুব সহজ ছিলনা।  টাওয়ার হ্যামলেট লেবার পার্টির সাবেক সদস্য লুৎফর রহমান ২০১০ সালে দল থেকে মেয়র পদে দাঁড়ানোর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন । কিন্তু ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ওই নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। ২০১০ সালের ওই নির্বাচনে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে, মেয়র হিসেবে বিপুল ভোটে  হয়েছিলেন তিনি। এবং সেটি বাঙালিদের এক তরফা ভোটের কারণেই সম্ভব হয়েছিল ।
আবার তাঁর বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ উঠে সেখানে ও বাঙালিরাই ছিলেন। বাঙালি কমিউনিটির অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
লুতফুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল , তাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য জনগণকে কাউন্সিল হাউজে তিনি  প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন। এ ছাড়া মুসলিম ভোটারদের ‘ভালো মুসলিম’ হিসেবে পরিচিতির কথা বলে তাকে সমর্থন করতে বলা হয়। ভোটের সময় তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যালট পেপার জালিয়াতি, পোস্টাল ভোটকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানো ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোট সরঞ্জামের ক্ষতি সাধনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল । এ ছাড়া তার চার সমর্থকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দলিল-পত্র নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছিল । পূর্ব লন্ডনের একটি আদালতে স্থানীয় বাসিন্দা অ্যান্ড্রু এরলাম, দেব্বি সিমন, আজমল হোসাইন ও অ্যাঞ্জেলা মোফাট এসব অভিযোগে পিটিশনটি দায়ের করেছিলেন।
নির্বাচন কমিশনার রিচার্ড ম্যারে জানিয়েছিলেন , লুতফুরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ও ধর্মকে অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।  এবং ২০১৪ সালে নির্বাচনে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে যাচ্ছি না। আমাদের সবারই কম বেশি সেই ইতিহাস জানা আছে।
লন্ডনে হাইকোর্টের রায়ে বিচারক তাকে তাৎক্ষিণকভাবে টাওয়ার হ্যামলেটস্‌ কাউন্সিলের মেয়রের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন ।সে সময় তাকে বরখাস্ত করা হলেও তার বিরুদ্ধে সাজা দেয়নি কোর্ট।কোর্টের নিদের্শে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণে তদন্তে নামে পুলিশ। সংবাদ মাধ্যমের ভাষ্যমতে   ১.৭ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করে দীর্ঘ এক বছর তদন্ত করে পুলিশ।কিন্তু, দীর্ঘ তদন্ত শে‌ষে এখন পু‌লিশ বল‌ছে, নির্বাচ‌নে অসচ্ছতা বা জা‌লিয়া‌তির ‌কোন প্রমাণ তারা পায়‌নি। জালিয়াতির সাথে লুতফুর রহমানের সরাসরি কোন সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়নি পুলিশ। লন্ডন মে‌ট্রোপ‌লিটন পুলিশ জানিয়েছে, লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত এমন কোন সুত্র তারা খুঁজে পায়নি। কোর্টের অনুরোধে এই তদন্তে ২০জন গোয়েন্দা কর্মকর্তা অংশ নেন। তারা নির্বাচনে জালিয়াতির সাথে জড়িত যথেষ্ট পরিমান এভিডেন্স খুঁজে পায়নি।
২০১৫ সালে একটি  আদালতে, নির্বাচনে  দুর্নীতি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় লুৎফর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়। এবং  অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষে কাজ করা আইনজীবীদের অর্থ বাবদ তাকে ৫ লাখ পাউন্ড অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়। তখন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পাঁচ লাখ পাউন্ড দিতে না পেরে লুৎফর রহমান নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন। এ পরিস্থিতিতে তাঁর  ‘ব্রোমলি-বাই-বো’ এর বাড়িটি নিলামে প্রস্তাবনা রয়েছে। করসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর পর বাড়িটির দাম ধরা হয়েছে আড়াই লাখ পাউন্ড।
তবে লুৎফুর রহমান সবসময়  নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। শুরু থেকেই ব্যক্তি ও মহল বিশেষের প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করেন। তাঁর আইন পেশার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। সহজ কথায় তাঁর দীর্ঘ জীবনের অর্জন টেমসের পানিতে ভেসে গিয়েছিল।
একটু পিছন ফিরে দেখলে, অখন্ড ভারতবর্ষকে ব্রিটিশরা  “ডিভাইড এন্ড রুল” এই নীতিতে পাকিস্তান আর ভারত নামে দুটি দেশে ভাগ করেছিল, যেখানে পাকিস্তান হয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আর ভারত হয় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি এমন পর্যায়ে হয়েছিল যে,
সূঁচ, পেন্সিল, চেয়ার, টেবিল, ফাইল রাখার আলমারি – এমনকি সরকারের পোষ মানানো জন্তু-জানোয়ারও নাকি   ভাগাভাগি হয়েছিল । এক হিসাবমতে যেসব জিনিস ভাগ হয়েছিলো তার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ২১টি টাইপরাইটার যন্ত্র, ৩১টি কলমদানি, ১৬টি সোফা, ১২৫টি কাগজপত্র রাখার আলমারি আর অফিসারদের বসার জন্য ৩১টি চেয়ার পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল। দেশভাগের কয়েক মাস আগে ইংল্যান্ড থেকে নেয়া  ৬০টি হাঁসও দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। বন বিভাগের সম্পত্তি জায়মুণি নামের একটি হাতিকে পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমন কি প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শ্ন নানা প্রত্নতত্বও ভাগাভাগি হয়েছিল। ব্রিটিশরা তো ভাগ করে দিয়ে চলে আসে, কিন্তু সেই বিভক্তির চারাগাছে পানি দিয়ে তাকে বড় করে তুললো সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মান্ধতা। দুই দেশেই সংখ্যালঘুদের উপর চলল সাম্প্রদায়িক অত্যাচার এবং দমন-পীড়ন, যা এখনো চলমান।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে  এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সব ভাষাতেই পাবেন, সব জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সব রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।
আমি ব্যাক্তিগত ভাবে লুতফুর রহমানের ঘটনাগুলো  সেই ডিবাইড এন্ড রুল হিসাবেই বিবেচনা করি। এবং আমাদের বাঙালি চরিত্রের সেই পরশ্রীকাতরতার অংশ হিসাবে দেখি।
আমার মনে আছে ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার যখন লুতফুর রহমান মেয়র হিসাবে বিজয়ী হয়েছিলেন আমি বাংলাদেশের পত্রিকায় বেশ উচ্ছস্বিত একটি নিউজ করেছিলাম। আমার এক প্রগতিশীল বন্ধু আমাকে সেই অপরাধে ফেইস বুকে তার বন্ধু তালিকা থেকে বাতিল করে দিয়েছিলেন। উগ্র ইসলামী পৃষ্টপোষক ব্যাক্তিকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার অপরাধে!তাঁর ধারণা আমি ভুল প্রমাণ করতে পারি নাই।

২০১৫ সালে লুতফুর রহমান রাবিনা খান এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে অহিদ আহমদ কে নিয়ে যে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু সফল হতে পারেন নি তিনি।   স্বীকার করুন কিংবা না করুন সেখানে ধর্মকে বা ধর্মীয় রাজনীতিকে ব্যবহার করা হয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের ৩২ শতাংশ বাঙালি ভোটার আছেন। যাদের প্রায় সকলেই মুসলমান ভোটার। কিন্তু লুতফুর রহমানের সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায়  বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াত ইসলামের সাথে সম্পর্কিত নেতৃবৃন্দই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যার কারণে প্রগতিশীল অংশটি সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে তাঁর সমর্থিত কাউন্সিল প্রার্থীদের যে ভরাডুবি হয়েছে তা ছিল কল্পনাতীত। অনেক প্রতিভাবান তরুণের ও ভরাডুবি হয়েছে সেখানে। যাদের মূল ধারার রাজনীতিতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল।
২০২২ সালের নির্বাচনে লুতফুর রহমান হয়তো আবার অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু ২০১০ সালের বাঙালি প্রার্থী হিসাবে তাঁর যে অবস্থান ছিল , সেই অবস্থান থেকে আদালত তাঁকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন নির্দোষ হিসাবে তাঁকে খালাস দিলেও ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে প্রমাণিত করা সম্ভব নয়।
বাঙালি আত্মপরিচয় নিয়ে তিনি ফিরে আসবেন নাকী শেষ নির্বাচনের  মতো আবার ও চিহ্নিত ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের পাশে নিয়েই তিনি ২০২২ সালের নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিবেন সেটি দেখার বিষয়। শুধু নির্দোষ প্রমাণে ফিরে আসা সহজ হবে না। ডিভাইডেশন এন্ড রুল ফর্মুলায়  মাঠ ছাড়া হয়েছেন বলেই আমার ধারণা। আদালতে বা পুলিশের খাতায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন হয়তো । কিন্তু সাধারণ ভোটারের কাছে বিশুদ্ধ হতে পারেন নি। কিংবা বাঙালি কমিউনিটির কাছে বিশেষ করে তিনি নির্দোষ নন।
বাঙালি কমিউনিটিতেও দুইটি ধারা বহমান একটি উগ্র ইসলামী ধারা একটি প্রগতিশীল ধারা।  এই দুই ধারা কখনো এক হবেনা। সেই হিসাবে একতাবদ্ধ কমিউনিটি হওয়ার সুযোগ বিলেতের বাঙালি কমিউনিটির খুবই কম। একমাত্র বাঙালি পরিচয় নিয়েই এই বিভক্তি কিছুটা ঘুচানো হয়তো সম্ভব ছিল। কিন্তু জামায়াত সমর্থিত কিংবা উগ্র ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাসীরা লুতফুর রহমানের সুসময় দুঃসময়ে তাঁর পাশে ছিলেন সেটাও সত্য।  লুতফুর রহমান কি তাঁর দুঃসময়ের সাথীদের ফেলে বিশুদ্ধ হয়ে আবারও বাঙালি কমিউনিটির নেতা হতে পারবেন ? গত মেয়র নির্বাচনে ‘’ ভাত খায় আকবর মোটা হয় জব্বর’’ শিরোনামে লেখায় বলেছিলাম, আমরা বাঙালিরা ভোট দিব , কিন্তু আমাদের বিভক্তির জন্য নেতা তৈরী করতে পারব না।
মিশ্র সংস্কৃতির ব্রিটেনে নিজেদের জাতিগত আত্মপরিচয় নিয়েই ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

জুয়েল রাজ

সাংবাদিক

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x