• মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২০

লন্ডনে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই-লিট সেমিনার সম্পন্ন/পূর্ব প্রজন্মের ঐতিহ্যেকে পৌঁছে দিন নতুন প্রজন্মের কাছে – আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

Posted on by

সারওয়ার-ই আলম  : পূর্ব প্রজন্মের ঐতিহ্যেকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমেই আমরা দূর করতে পারি জাতি সত্ত্বার সংকট, করতে পারি আদর্শ জাতি সত্ত্বার বিনির্মাণ। তা নাহলে আমাদের নতুন প্রজন্ম তাদের গর্বের , অহংকারের স্মৃতি খুঁজে পাবে না। তাদের চিন্তার জগত বদলে যাবে। গতকাল ১৫ জুলাই ইস্ট লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃক আয়োজিত ‘ মেমোরি অ্যান্ড আইডেন্টিটি” শীর্ষক সেমিনারে কথাগুলো বলেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ।

 

তিনি বলেন, প্রতিটি প্রজন্মের কাছে সময়ের একটি দাবী থাকে। আর সে দাবিটি হলো ইতিহাসের অন্তরাল থেকে গৌরবের ও ঐতিহ্যের স্মৃতিগুলেকে তুলে এনে নতুনদের কাছে তা তুলে ধরা। তাদেরকে জানানো জাতির গৌরব গাঁথা। যদি তাই করা হয় তাহলে বাংগালি সংস্কৃতি ভালবাসতে আমাদের সন্তানদের ওপর আর বল প্রয়োগ করতে হবে না। ঐতিহ্যের  অনুসন্ধানে যেয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজনে করে নেবে শিকড়ের সন্ধান। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বায়নের এ উত্তাল সময়ে শুধু প্রবাস নয়,  স্বদেশের সামাজিক বাস্তবতায়ও  এ চর্চাটি নিশ্চিত করা আজ বড় বেশী জরুরী।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লন্ডন চ্যাপ্টারের চেয়ার শামীম আজাদের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আন্তর্জাতিক সেমিনারে আবহমানকাল ধরে অবিভাসীদের অস্তিত্বের সংগ্রাম, অধিকার আদায়ের স্মৃতি, দ্বন্দ্ব- সন্দিগ্ধ আত্মপরিচয়, নতুন জাতি সত্ত্বায় ব্যক্তির নিজেকে সংযুক্ত করার স্পৃহা ও প্রতিস্পর্ধা, প্রজন্মের মধ্যকার সংকট ও তার উত্তোরণের ওপর ব্রিটিশ ও বাংলাদেশী কবি, লেখক, নাট্যকার, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও অর্থনীতিবিদগণ বিশদ আলোচনা করেন।

লাফবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের – এর মিডিয়া অ্যান্ড মেমোরি স্টাডিজ এর অধ্যাপক ডক্টর এমিলি কেইটলি ‘ রিইমাজেনিং মেমোরি’- এর ওপর আলোচনার করতে গিয়ে বলেন, ব্যক্তিসত্ত্বা ও জাতিসত্ত্বার গঠনের একটি প্রধান অনুঘটক হলো অর্জিত স্মৃতি। পরিবার ও সমাজে চর্চিত সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি থেকে এ স্মৃতি সন্চারিত। কিন্তু গবেষণায় জানা যায় এর বাহিরেও স্মৃতির পুণর্গঠন সম্ভব। কন্সট্রাকটিভ ডায়ালগ বা গঠনমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা কাংখিত স্মৃতি নির্মাণ করতে পারি যা কি না দুই প্রজন্মের মধ্যে সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম।

কিংস কলেজের রিডার ডক্টর জন উইলসন প্রাগৈতাসিক বাস্তবতায় বাংলাদেশীদের জাতি সত্ত্বা, একাত্তরের নতুন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের সাথে সাথে সংবিধানে নতুন জাতিটির বৈশ্বিক পরিচয়ের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরে বলেন স্বাধীনতা অর্জনের বহু আগে থেকে বাংগালি জাতির অস্তিত্ব ছিল, স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে বাংগালি জাতি তাকে সাংবিধানিক কাঠামোয় ধারন করলোএবং তাদের পরিচয়ের ভিত্তিটি আরো সুদৃঢ় হলো।

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার,       বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ডক্টর শাহাদুজ্জামান বলেন, অন্তর্গত সত্য হলো সহস্র মাইল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে আসা বাংলাদেশীরা একটি দ্বিধান্বিত সত্ত্বাকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকেন। জীবনের  অনিবার্য প্রয়োজনে প্রিয় মানুষ, প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে চলে আসা এ মানুষগুলো নতুন জীবনের জন্য নিজেদেরকে তৈরী করার সুযোগ পান না। তারপরও তারা পরাজয়ের গ্লানি মেনে নেন না। এক ধরনের আপোষকামীতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় তাদের নতুন ব্যক্তি সত্ত্বা যেখানে স্বদেশের মায়া, স্মৃতি কাজ করে যায় নীরবে, কখনো ব্যক্তির অজান্তে।

ইউএনডিপির ডক্টর সেলিম জাহান সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্মৃতি কিংবা অভিজ্ঞান আমাদের ব্যক্তি ও জাতিসত্ত্বা নির্মাণের প্রক্রিয়া, পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সৃষ্ট সংকট ও তার সমাধানের ওপর বিশদ পর্যালোচনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের স্মৃতি কিন্তু ধ্রুব কিংবা অপরিবর্তনশীল কোন বিষয নয়। আমরা ক্রমাগত চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন সুখ-স্মৃতি নির্মাণ করতে পারি যা কিনা আমাদের জাতিসত্ত্বাকে পৌঁছে দিতে পারে অনন্য উচ্চতায়। তিনি তথাকথিতে মেইনস্ট্রিম কে শ্রদ্ধা, সংহতি, ভালবাসার নব আংগিকে পুনর্গঠনের ওপর ও গুরুত্ব আরোপ করেন।

কবি স্টিফেন ওয়াটস একাত্তর থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত ব্রিটেনে বাংলা সাহিত্য চর্চার তথ্যবহুল পর্যালোচনা তুলে ধরে বলেন বাংলা ভাষাভাষীদেরকে আরো বেশী করে তাদের সাহিত্য কর্মগুলোকে অনুবাদের উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাট্য গবেষক সুদীপ চক্রবর্তী একাত্তর, পঁচাত্তর ও নব্বইয়ের সামাজিক উন্মাতাল সময়ে আমাদের সংকট, জাতি সত্ত্বায় তার সক্রীয় প্রভাব এবং নাট্য আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

কয়েক পর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানটি বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালনার করেন সাংবাদিক বুলবুল হাসান ও কাউন্সিলর সায়মা আহমেদ। অতিথিদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন খাদিজা রহমান। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলোকে নিজস্ব অভিজ্ঞতায় সংকলিত করে উপস্থাপন    করেন ফারাহ নাজ।
অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ‘আলো আমার আলো , ওগো আলোয় ভুবন ভরা ‘ সমবেত সংগীত দিয়ে। এছাড়াও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের শিল্পীগণ বিভিন্ন পর্বের শুরুতে লালন ও বাউল গান পরিবেশন করেন।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x