• শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

রেলের পণ্য পরিবহনে আয় বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ছে

Posted on by

মহাসড়কে ভারী যানবাহনে নির্দিষ্ট ওজনের অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। বিষয়টিকে রেলের পণ্য পরিবহন ও আয় বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো রক্ষার জন্য এক্সেল লোড ব্যবস্থাপনার নীতিমালা বেশ কঠোরভাবে পরিপালন করছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এ নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট এক্সেল লোডসম্পন্ন যানবাহনে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের ওপর উচ্চহারে জরিমানার বিধান রেখেছে মন্ত্রণালয়। ১ ডিসেম্বর থেকে চালুকৃত এ নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে নির্দিষ্ট এক্সেলের চেয়ে বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ  বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পণ্য পরিবহনে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও অর্থসাশ্রয়ের তাগিদে ব্যবসায়ীরা রেলে পণ্য পরিবহনে বেশি আগ্রহী হবেন। কম খরচে মূলধনি যন্ত্রপাতি, ভারী পণ্য  পরিবহনে রেলের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে উঠবেন তারা।

একসময় দেশে ভারী পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম ছিল রেলওয়ে। কিন্তু দেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় রেলপথে পণ্য পরিবহন কমে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও পণ্য পরিবহন খাতে আয় বাড়াতে ব্যর্থ হয় রেলওয়ে। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনের জন্য আলাদা একটি সংস্থাও গঠন করেছে রেলওয়ে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি না থাকায় রেলের পণ্য পরিবহনে কার্যক্রম বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছিল। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলের মোট রাজস্ব আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাড়লেও পণ্য পরিবহন খাতে আয় প্রবৃদ্ধি ছিল হতাশাজনক।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুটি কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকায় কমলাপুর আইসিডির উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এছাড়া আরো দুটি ট্রেন কমলাপুর আইসিডি থেকে পণ্য অথবা খালি কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। একটি ট্রেন প্রতিদিন চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে কনটেইনার লোডিংয়ে নিয়োজিত থাকে। এছাড়া প্রতিদিন চার-পাঁচটি ট্রেন খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে সারা দেশে চলাচল করে। প্রতি বছর নানাবিধ খাতে রেলের আয় প্রবৃদ্ধি হলেও পণ্য পরিবহন খাতে তা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। পণ্য পরিবহনে বেশি সময় লাগার কারণে ব্যবসায়ীরাও এজন্য সড়কপথের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী হলেও এ খাতে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারেনি রেলওয়ে। এ অবস্থায় এক্সেল লোড  নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়নে পণ্য পরিবহন বাবদ রেলের আয়বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে রেলের মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৯০৪ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে সংস্থাটির আয় বেড়েছে ৩৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গত কয়েক বছরে রেলের সার্বিক ভাড়া দুই দফায় বাড়ানো হলেও পণ্য পরিবহন খাতে প্রবৃদ্ধির হার খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেলের পণ্য পরিবহন খাতে আয় হয়েছিল ১৭৪ কোটি, ২০১৫-১৬ সালে ১৭৭ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৬৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ গত অর্থবছরে রেলের পণ্য পরিবহন বাবদ আয় বেড়েছে ৮৭ কোটি ৪৬ লাখ ৫ হাজার টাকা।

অন্যদিকে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য রেলের পণ্য পরিবহন বাবদ আয় বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সড়ক ও  জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে চলাচলরত পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর তিন ধরনের এক্সেল রয়েছে। এর মধ্যে ছয় চাকাবিশিষ্ট দুই এক্সেলের ট্রাক পণ্য পরিবহন করতে পারবে ১৫ টন। এছাড়া ১০ চাকাবিশিষ্ট তিন এক্সেলের ট্রাক ১৮ টন ও চার এক্সেলের ১৪ চাকার ট্রাক ২৭ টন পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এর আগে এসব ট্রাক নিয়ম লঙ্ঘন করে নির্ধারিতের কয়েক গুণ পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করত। বর্তমানে এ নিয়ম লঙ্ঘন করলেই পণ্যবাহী পরিবহনগুলোকে উত্সস্থলে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে অতিগুরুত্বপূর্ণ যানবাহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত এক্সেলের অতিরিক্ত পণ্যের প্রতি টনের জন্য ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পণ্য লোডিংয়ের উত্সমুখে এক্সেল লোডের নির্দেশনা মেনে চলতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছেও অনুরোধ জানিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো রক্ষায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক্সেল লোড ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে পরিপালনের কারণে ব্যবসায়ীরা রেলমুখী হবেন। অর্থাত্ মূলধনি যন্ত্রপাতি, ভারী পণ্য ও কম খরচে বেশি পণ্য পরিবহনে  ব্যবসায়ীরা রেলের ওপর নির্ভরশীল হবেন। নির্দিষ্ট এক্সেল লোডসম্পন্ন যানবাহনে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের ওপর উচ্চহারে জরিমানার বিধান রাখায় সময় বেশি লাগলেও ব্যবসায়ীরা রেলে পণ্য পরিবহনে বেশি আগ্রহী হবেন বলে আশা করছেন তারা।

তবে পণ্য পরিবহন খাতে রেলের আয় বাড়ানোর প্রধান প্রতিবন্ধকতা ইঞ্জিন সংকট। রেলের প্রকৌশল দপ্তর জানিয়েছে, রেলওয়ে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে ২০ শতাংশের বেশি ইঞ্জিন নিয়ে যাত্রিবাহী ট্রেন সার্ভিস চালাচ্ছে। ফলে চাহিদা থাকলেও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ইঞ্জিন সরবরাহ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রী পরিবহনের ট্রেনগুলো সেবাধর্মী হওয়ায় সংকটকালীন সময়ে মজুদ ইঞ্জিন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হলেও এ খাতে পর্যাপ্ত ইঞ্জিন সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজনে রেলবিমুখ হয়ে পড়েছেন। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পণ্য পরিবহন খাতে রেলের হারানো গৌরব ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার সাহাদাত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, গত এক বছরে রেলওয়ে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। লক্ষ্য অনুযায়ী আয় বাড়াতে যাত্রী খাতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন বাবদ আয় বাড়াতেও সচেষ্ট আমরা। এজন্য একটি আলাদা কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। ইঞ্জিন সমস্যার সমাধান করা গেলেই রেলওয়ে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী লাভের মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Reply

More News from বাংলাদেশ

More News

Developed by: TechLoge

x