আজ সোমবার,২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

তুরস্কের ব্যার্থ সামরিক ক্যু’র এক বছর পূর্তি ট্যাংকের সামনে বুক পেতেছিলেন যারা

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০১৭ ৪:২৭ অপরাহ্ণ   আপডেট: জুলাই ২৭, ২০১৭ at ৮:০১ পূর্বাহ্ণ
 

মোহাম্মদ শাকিল উদ্দিন:
গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তুরস্ক চারবার সফল সামরিক ক্যু’র মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু গত বছরের ১৫ জুলাই পঞ্চমবারটি সফল হতে পারেনি। গত শনিবার ছিল তুরস্কের ব্যার্থ সামরিক ক্যু’র এক বছর পূর্তি। সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী অংশ রাতের আধারে দখল করতে চেয়েছিল ক্ষমতা। রাজপথে লক্ষ জনতার ¯্রােত ঠেকিয়ে দিয়েছে সে ক্যু। বুকের তাজা রক্তে লাল করেছে ইস্তাম্বুল সহ তুরস্কের রাজপথ। নির্দিধায় ট্যাঙ্কের সামনে পেতে দিয়েছে বুকের পাজর, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও বুলেট ভরা মেশিনগানের সামনে এগিয়ে গেছে। প্রান দিয়েছ। দেশের জন্য শহীদ হয়েছে, হাত-পা অথবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে সহস্য হয়েছে পঙ্গু। কি ঘটেছিল সেদিন? বিদ্রোহরে রাতের কয়েকজন অকুতভয় দেশপ্রেমিক শহীদ এবং গাজী বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

আয়শে আইকাস(৪৪):
আয়শে আইকাস তুরস্কের ব্লাক সী এলাকার একজন বাসীন্দা। সন্ধ্যায় টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখে প্রার্থনা স্বরুপ কোরআন পড়তে শুরু করেন। ঘরের বাহিরে খুব একটা বের হননা গৃহিনী আয়শে কিন্তু যখন স্বামী মোস্তাফা সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধে রাজপথে যাচ্ছিলেন তিনিও বললেন ‘আমিও যেতে চাই’। অনুরোধ অস্বীকার করলেও শুনেননি। কিছুটা জোরপূর্বক বললেন ‘আমি আসছি’। যেহেতু আয়শে শুনবেন না তাই তাকে নিয়েই বের হলেন মোস্তফা। তিন ছেলে সাথে আসবে বলে বায়না ধরলেও কাউকেই নিতে রাজি ছিলনা আয়শে। সন্তানদের ঘরে রেখে এ দম্পতি তুরস্ককের ইউরোপ এবং এশিয়ার সাথে যুক্তকারী বসফরাস সেতুর পাদদেশে চলে আসে যেখানে আরো অসংখ্য তুর্কি জনগন ইতোমধ্যে মার্চ করছে। এ সেতুতে বেরিকেট দিয়ে রেখেছে সেনাবাহণীর একটি অংশ। মোস্তফা গাড়িতে থাকতে বলে বের হলেও আয়শে তা শুনেনি। স্বামীর পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে গেছে। “আমার হাত ধরে অনেকটা টেনে সকলের সামনের সারিতে নিয়ে যাচ্ছিল সে, আমি তাঁর চোখে মুখে এক অকুতভয় শহীদী ইচ্ছা, আয়শে তারাহুরা করছিল হয়তো সে তার কাঙ্খিত শহীদী মৃত্যুর আকাঙ্খায় কাতর ছিল।” তিন দশকের দাম্পত্ব জীবনের সঙ্গীর সাথে শেষ সময়টুকু কাটানোর প্রতিটি মুহুর্ত্ব এভাবেই বর্ণনা করছিলেন মোস্তফা আইকাস। খনিকের মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি ¯িœপার বুলেট ছিদ্র করে দেয় আয়শের বুক। মোস্তফা কিছু না বুঝে উঠার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আয়শে। “আমি পাগলের মতো আয়শেকে জিজ্ঞেস করি “কি হয়েছে তোমার?” কিন্তু সে কোন জবাব দিতে পারেনি। খুব শান্ত স্বরে কালেমা তাইয়্যেব পড়ার শব্দটুকু আমি বুঝতে পারলেও পরের লাইনটুকু আর আমি বুঝতে পারিনি।” হাসপাতালে নেয়া হলেও মৃত্যু অনেক আগেই পরপারে নিয়ে গেছে আয়শেকে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানে একটি টমেটো গাছ লাগিয়েছে মোস্তফা যার পরিচর্চা করে স্ত্রী‘র সাথে কাটোনো শেষ সময়ের স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করেন। আর শ্রদ্ধাভরে মমতাময়ী মাকে স্বরণ করেন ছবি বুকে নিয়ে অশ্রুজলে তিন সন্তান ।
কাঠমিস্ত্রি হাসান জেনস(৪৪):
“আমাদের প্রেসিডেন্ট যখন ভিডিও বার্তায় বলছিলেন সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করেছে এবং জনগনকে রাস্তায় নেমে তা প্রতিরোধ করতে হবে, তিনি বলছিলেন যদি আজকের রাতে তোমরা রাস্তায় নামো তাহলে হয়তো দেশকে বাঁচাতে পারবে, কালকে হয়তো দেরী হয়ে যাবে। খবরটি শুনা মাত্র আমি দেরী করিনি । গ্যারেজ থেকে জেধারএফ হুন্ডাটি নিয়ে বসফরাস সেতুর দিকে রওনা দিলাম।” ১৫ জুলাই ২০১৬ তারিখের কালো রাতের এভাবেই বর্ণনা দিচ্ছিলের সেদিন বেঁচে ফেরা কাঠমিস্ত্রি হাসান জেনস(৪৪)। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে দোকানে চা খাবার সময় সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহের খবর পান হাসান। বাইক প্রেমীক হাসান যেখানেই যান তার মটরসাইকেল থাকেন তার সাথে। বলেন, “আমি যখন সেনাবাহিনীর দিকে রওনা দিয়ে যাচ্ছিলাম একদল পুলিশ আমাকে বাধা দিয়ে বলেছিল “ঐদিকে যেওনা গুলি খেয়ে মারা পড়বে”। কিন্তু আমি শুনিনি। প্রবাদ অনুযায়ী আমার বিশ্বাস ছিল, যারা অনেক কিছু কিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোনদিন নায়ক হতে পারেনা। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ট্যাঙ্কের বরাবর আমার হুন্ডা চালিয়ে যাব।” ট্যাঙ্কের নিকটে যাবার আগেই আর্মির ছুঁড়া দুটি স্্িরন্টার হাসানের গায়ে লাগে একটি বাম পায়ে আর অন্যটি ডান বাহুতে। বাইক থেকে ছিটকে পড়েন সে। সে অবস্থায় শিরচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়া হয়। ঠিক সে সময় রক্তাক্ত এক মহিলা এসে হাসানকে না মারার জন্য আকুতি করতে থাকেন। হাসান বলেন, “এখনও বিশ্বাস করতে পারিনা ঠিক সে সময়ে নারীটি কিভাবে ঐস্থানে এসে পৌছুলো।” দ্রুত আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলে প্রানে বেঁচে যান বীরপুরুষ হাসান জেনস।

ইউনুস ইমরেইজার (৩৮):
১৫ জুলাই ২০১৬ তারিখের বিদ্রোহী সামরীক বাহিনীর ক্যুতে নিহত এক শহীদের নাম ইউনুস ইমরেইজার। পেশায় সে একজন বিজ্ঞাপনদাতা। ৯ বছরের কন্যা মরিয়াম তার বাবার স্মৃতিচারন করে বলে “আরো অসংখ্য মানুষের মতো বাবাও সেদিন রাস্তায় নেমেছিল বিদ্রোহ ঠেঁকাতে। আমি তার জন্য চকলেট কেক বানিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু সে ফিরে আসেনি।” মরিয়াম আরো বলে, আম্মু অনেক চেষ্টা করেছিল তাকে বাধা দিতে কিন্তু তার আচরণ এমন ছিল যেন দরজা বন্ধ করলে সে জানালা দিয়ে বের হয়ে যাবে। কোন ভাবেই যেন তাঁকে ঘরে রাখা সম্ভব ছিলনা।” স্বামীর সাথে ফাতেমার ফোনে কথা হয় রাত দেরটার দিকে। ইউনুস জানায় ৩০ বছর বয়সী এক ব্যাক্তি তার সামনে এইমাত্র গুলিতে মারা গেল। এ কথা স্ত্রীকে বলার পর ফাতেমা শুনতে পায় ইউনুস তার ভাইকে বলছে “ফারুক চলো, সামনে চলো। আজ যদি দেশ অন্যের হাতে চলে যায় তাহলে শত বছর অন্যের অধীনে চলে যেতে হবে।” এর পরেও বেশ কয়েকবার স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কথোপকথন হয়েছিল কিন্তু শেষ বারের কথায় ইউনুস বলেছিল সে ফিরে আসছে কিন্ত সে ফিরেনি। মাত্র ১৫ মিনিট পরই ইউনুসের এক বন্ধু ফাতেমাকে ফোনে জানায় ইউনুসকে শহীদ হিসেবে ঘোষনা করতে। ভাইকে হারিয়ে ফারুক হতবিহবল। সে প্রতিরাত্রে ভাইকে শেষবারের মতো যে জায়গাটিতে জীবিত দেখেছে সেখানে যায়, ধুমপান করেন এবং তাঁর স্মৃতী স্বরণ করেন। মরিয়াম তার বাবাকে প্রায়ই স্বপ্ন দেখে, সে দেখে বাবা দুটি বাক্স নিয়ে এসেছে একটি মারিয়ামের জন্য আর অন্যটি তার মা ফাতিমার জন্য। মায়িামের বাক্সে ভরা থাকে গোলাপ আর মা’র বাক্সে কোরআন এবং তসবী।

সাফি বায়াত( ৩৪):

তুরস্কের ক্যু‘র রাতের অসংখ্য ভিডিওর মধ্যে যে ক্লিপটি পুরো বিশ্বের নজর কেরেছে তা হলো ৩৪ বছর বয়সী গৃহিনী সাফি বায়াতের সাহসীকতা। স্বামী তখনও ড্রাইভিং থেকে ফিরেনি আর দু সন্তান নানবাড়ি। বাসায় টেলিভিশন অন করতেই দেখলেন সেনাবাহিনীর ট্যাংক টহল দিচ্ছে ফসফরাস সেতুর ইস্তাম্বুল এশিয়ান দিক থেকে ইউরোপীয়ান পার্শ্বে। সেতুর খুব একটা দূরে নয় সাফি বায়াতের বাসা। বাহিরে কি হচ্ছে দেখার কৌতুহলে এক পা দু পা করে রাজপথে পা বাড়াতেন তিনি। সেনাবাহিীর দিকে যাওয়ার সময় পথে পুলিশ তাকে বাধা দিতে চাইলেও কোন বাধা তাঁকে আটকাতে পারেনি। আর এরপর যা ঘটেছে তা দেখেছে পুরো বিশ্ব। ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় মার্চ করতে করতে ট্যাংকের নিকটে চলে যান সাফি, অসম সাহসীকতা নিয়ে অস্ত্রের নলের মুখে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে সাহসীকতায় বিদ্রোহী সেনাদের জিজ্ঞেস করেন “তোমরা এখানে কেন? কেন সেতুর পথ আটকে দিয়েছো? ট্যাংকের কোন কাজে নেই এই সেতুর উপর! তোমরা তোমাদের ব্যারাকে ফিরে যােেচ্ছা না কেন ?”
এক সেনা কর্মকর্তা সাফি‘র উপর গুলির নির্দেশ দেয়, গুলি ছুঁড়ার কথা শুনে সাফি দু‘হাত প্রসারিত করে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেন। ভিডিওটিতে দেখা যায় উদ্বিগ্ন এক সেনা সাফির বাহু ধরে ধাক্কা দিয়ে মোবাইল ছোঁড়ে ফেলে দেয়। দূর থেকে মোবাইলে ধারন করা ভিডিওটিতে দেখা যায় সাফি ফিরে অন্য বিক্ষোভকারীদের সাথে যখন মার্চে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন ঠিক সে সময় গুলি চালানো হয়। গুলির মধ্যেও নিজের জিবন বিপন্ন করে অন্য অহত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যায় সাফি এবং পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। ডান পায়ে পচন্ড ব্যাথা নিয়ে সাফি বায়াত চলা ফেরা করেন। শরীরে ব্যাথা থাকলেও মনে রয়েছে তার প্রশান্তি। বলেন, “আমাদের নিস্পাপ শরীর আর নিরস্ত্র দেহই ছিল সেদিন আমাদের মূল অস্ত্র। আল্লাহকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে সম্মানীত করেছেন।”

ইব্রাহীম ইলমাক(২৫):
১৫ জুলাইয়ের সে কালো রাতে শত শত তার্কি জনগনের সাথে প্রাণ বিসর্জন দেন আরো একজন যুবক নাম ইব্রাহীম ইলমাক। ২৫ বছরের টগবগে যুবক ইব্রাহীম। বিয়ে করেছিলেন মাত্র বছর তিনেক আগে। স্ত্রী এসমা ইলমাজ একজন কোরআনের শিক্ষক, পেশায় ইব্রাহীম ছিলেন ইমাম এবং মুখস্থ পুরো কোরআন বিভিন্নভাবে উচ্চারনের মতো একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী হাফেজ। এ দম্পতির একটি মেয়ে আছে তার বয়স এখন এক বছর নয় মাস। ১৫ জুলাইয়ের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে স্ত্রী ও সন্তানকে শ্বশুরবাড়ি জার্মানী পাঠিয়েছিলেন ইব্রাহীম। সেদিনের ঘটনা স্বরণ করতে গিয়ে ইসমা বলেন, “টেলিভিশনে তুরস্কের ক্যু‘র খবর পাওয়া মাত্রই অজানা এক ভয়ে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমার পিতা আমাকে সান্তনা স্বরুপ সব ঠিক হয়ে যাবে বললেও, প্রতোত্তরে বলি হয়তো ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু না জানি কতো সন্তানের প্রান যাবে এ বিদ্রোহে।” এর কিছুক্ষন পরেই টেলিভিশনের পর্দায় ইসমার শ্বশুর এক যুবকের লাশ ধরে কাঁদছে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন ইসমা। তিনি প্রার্থনা করতে থাকেন এ যেন ইব্রাহীম না হয়। কিন্তু সত্য নির্মম হলেও সত্য। ইসমা জানান, “আমি মনে মনে বলছিলাম হয়তো আমার শ্বশুর ভুলে কারো মৃত শরীর ইব্রাহীমের বলে ভুল করছে কিন্তু কোন পিতা তার সন্তানকে চেনতে যে ভুল করতে পারেনা তাও আমার জানা।” যৌবনে স্বামী হারিয়ে একমাত্র সন্তানের মধ্যে স্বামীর শেষ স্মৃতী আকঁরে আছেন ইসমা। আর হৃদয়ে আছে অসীম মনোবল “তারা আমাদের দেশ কখনও দখল করতে পারবো না, তা রাইফেল দিয়েই হোক অথবা ট্যাংক। আমরা যতই ত্যাগ করিনা কেন দেশের একবিন্দ্রু মাটিও আমরা কাউকে ছেড়ে দিতে রাজি নই।”

সূত্র: টিআরটি ওয়াল্ড

মোহাম্মদ শাকিল উদ্দিন
সাংবাদিক

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1147 বার
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 

ক্যালেন্ডার