আজ বৃহস্পতিবার,২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী

নীরবতা ভাংলেন ড. ইউনূসঃরোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়ে খোলা চিঠি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৭ ১০:২৮ অপরাহ্ণ   আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
 

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকাঃ রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়ে খোলা চিঠি লিখেছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চিঠিতে তিনি ওই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরাপত্তা পরিষদের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। ড. ইউনূসের চিঠিটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।

নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও সদস্যবৃন্দ,

আপনারা অবগত আছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন এলাকায় মানবীয় ট্রাজেডী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ একটি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে, যে বিষয়ে অবিলম্বে জাতি সংঘের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

বিভিন্ন সুত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আক্রমণে শত শত রোহিংগা জনগণ নিহত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বহু গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে এবং শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। আতংকের বিষয়, মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে এই এলাকায় প্রায় একবারেই প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছেনা যার ফলে দারিদ্র পীড়িত এই এলাকায় মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্থানীয় সরকার সূত্রগুলোর হিসাবে, গত ১২ দিনে এক লক্ষ কুড়ি হাজারেরও বেশী মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মৃত্যুর মুখে নারী, পুরুষ ও শিশুদের এই ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে।

গত বছরের শেষে পরিস্থিতির বেশ অবনতি ঘটলে বেশ কয়েকজন নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ সহ আমি এ বিষয়ে জরুরী হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আপনাদের নিকট যৌথভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আপনাদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এবার পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির প্রেক্ষিতে নিরীহ নাগরিকদের উপর অত্যাচার বন্ধ এবং রাখাইন এলকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবার জন্য আমি আপনাদের নিকট আবারো অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমি জাতি সংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে জরুরীভাবে হস্তক্ষেপের জন্য আহবান জানাচ্ছি। আমি আপনাদের কাছে জরুরী পদক্ষেপের অনুরোধ জানাচ্ছি যাতে নিরীহ বেসামরিক মানুষদের উপর নির্বিচার সামরিক আক্রমণ বন্ধ হয়, যার কারণে এই অসহায় মানুষগুলোকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হতে না হয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার ২০১৬ সালে যে “রাখাইন অ্যাডভাইজরী কমিশন” গঠন করেছিল তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে আপনারা যেন জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন – সেজন্য আমি বিশেষভাবে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি । কফি আনানের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিশন Ñ যার অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন মিয়ানমারের নাগরিক – রোহিংগাদের নাগরিকত্ব প্রদান, অবাধ চলাচলের সুযোগ, আইনের চোখে সমান অধিকার, রোহিংগাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যার অভাবে স্থানীয় মুসলিমরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, এবং নিজ ভূমিতে ফিরে আসা মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতি সংঘের সহায়তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছিল।

দশকের পর দশক ধরে চলা নির্যাতন র‌্যাডিকালাইজেশনের জন্ম দিচ্ছে, যা “রাখাইন অ্যাডভাইজরী কমিশন” যথাযথই উপলদ্ধি করেছেন। এই ভীতি থেকে র‌্যাডিকেলদের দ্বারা মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর আক্রমণ একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ফলে এই এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠনশীল উদ্যোগ নেয়া না হলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকবে যা পাশ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

রোহিংগাদের বিরুদ্ধে এই ক্রমাগত সহিংসতা বন্ধ করতে জাতি সংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্মপন্থায় সাহসী পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। মিয়ানমার সরকারকে জানিয়ে দেয়া দরকার যে, সে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থায়ন রোহিংগাদের প্রতি মিয়ানমার সরকারের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। মিয়ানমার সরকারকে জানিয়ে দেয়া দরকার যে – অপপ্রচার, ঘৃণা ও সহিংসার উস্কানি বিশেষ করে রোহিংগাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, নিবর্তনমূলক বিভিন্ন নীতি ও আইন বাতিল করতে হবে এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতি সংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবীয় সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা পালন করেছে – এটা দেখার জন্য বিশ্ববাসী অপেক্ষা করছে।

আপনাদের বিশ্বস্ত,
মুহাম্মদ ইউনূস
(সূত্রঃমানব জমিন)

 

 

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1260 বার
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

সব মেনু এক সাথে

 

ক্যালেন্ডার