আজকে

  • ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২২শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

সুরেন্দ্র কুমারকে ডিজিএফআইয়ের চাপ ও কয়েকটি প্রশ্ন

Published: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৪, ২০১৮ ৩:৪৭ অপরাহ্ণ    |     Modified: বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৮, ২০১৮ ২:১৪ পূর্বাহ্ণ
 

অলিউল্লাহ নোমান :বিচার বিভাগ, সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটা উঠে এসেছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইয়ে। তবে বইয়ে তিনি ডিজিএফআই দ্বারা নিজে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি শুধু বলেছেন। ডিজিএফআই দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর নেতৃত্বে যে রায় গুলো হয়েছে সেই বিষয়ে কোন কথা বলেননি।

বইয়ের চ্যাপ্টার ২৯-এ তিনি নিজে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন সবিস্তার। প্রথমে ডিজিএফআই-এর এক কর্মকর্তা তাঁর সাথে কথা বলেন ফোনে। তিনি এশিয়া ফ্যাসিফিক অঞ্চলের বিচারকদের একটি সম্মেলনে যোগদানের জন্য জাপানে ছিলেন তখন। ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তা ফোনে তাঁকে দেশে ফিরতে বারন করেছিলেন। কিন্তু তারপরও তিনি দেশে ফিরেছেন। এজন্য তিনি সাধুবাদ পেতে পারেন।

দেশে ফিরে কি করলেন তিনি? আসুন দেখি তাঁর বর্ণনায় কি বলা হয়েছে। তাঁর বয়ানে উঠে এসেছে, দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভীর সাথে কথা বলেছেন। গওহর রিজভীকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিতে!

বর্ণনায় আরো উঠে এসেছে, কোর্ট খোলার আগের দিন ডিজিএফআই-এর প্রধান এসেছেন সুপ্রিমকোর্টে তাঁর দফতরে। ডিজিএফআই প্রধান তাঁর সাথে সেদিন যে আচরণ করেছেন, সেটা তিনি লিখেছেন। তাঁর অসুস্থতার জন্য ছুটির বিষয়টিও ডিজিএফআই লিখে তাঁর সামনে দিয়েছিল এটাও বলেছেন। এখানেই শষ নয়। ডিজিএফআই প্রধান আবারো এসেছেন তাঁর বাসায়। তাঁকে দেশ ছাড়তে চাপ দেওয়ার জন্যই ডিজিএফআই মহাপরিচালক প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনে আসা। সেই চাপে বাধ্য হয়ে তিনি দেশ ছাড়লেন।

প্রশ্ন হচ্ছে ডিজিএফআই-এর নির্দেশ আদেশ কি এটাই প্রথম ছিল নাকি আরো ছিল? তিনি কি এবারই প্রথম ডিজিএফআই-এর আদেশ পালন করেছেন!

আসুন আমরা দেখি বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির মামলার ঘটনা। হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের পর বেগম খালেদা জিয়া আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলের আবেদন করলেন। সেটা শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য ছিল। সেই ধার্য্য তারিখে ডিজিএফআই-এর অনেক অফিসারকে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে দেখা গেছে। সাদা পোশাকে তারা উপস্থিত ছিলেন। সেদিন একজন অফিসারের সাথে আমার নিজেরও পরিচয় হয়েছিল। নামটা এই মূহুর্তে ভুলে গিয়েছি। তিনি ছিলেন একজন মেজর। এছাড়া সুপ্রিমকোর্টে সেদিন ডিজিএফআই ও সাদা পোশাকে পুলিশের পুরো নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছিল। ডিজিএফআই বা সাদা পোশাকে পুলিশরা জানল কেমন করে শুনানী ছাড়াই বেগম খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ হবে!!?? নাকি তাদের চাপে সেটা হয়েছিল সেদিন! একটু লিখতে পারতেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

বেগম খালেদা জিয়ার মামলা যে ডিজিএফআইয়ের নির্দেশেই শুনানী গ্রহন ছাড়াই খারিজ হয়েছিল, বিষয়টা তখন মুখে মুখে প্রচারিত ছিল। সেই সিনহা বাবুরাই ডিজিএফআইয়ের নির্দেশে আদালত পরিচালনার সংস্কৃতি চালু করেছিলেন। তাবে তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়, নিজের গায়ে লাগার পর তিনি বিষয়টি জাতির সামনে খোলাসা করেছেন। তবে, ডিজিএফআই-এর নির্দেশনায় সুপ্রিমকোর্ট পরিচালনার সংস্কৃতি চালু করার দায় থেকে রেহাই পেতে পারেন কি তিনি?

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বইয়ের ২৭নং চ্যাপ্টারে ১৬তম সংশোধনীর রায় নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর ৭জন বিচারপপতি মিলেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল রায়টি লিখবেন প্রধান বিচারপতি। সে মোতাবেক তিনি রায় লিখে তাদের সামনে দেয়ার পর বিষ্মিত হলেন। আবদুল ওয়াহাব মিঞা জানালেন তিনি নিজেও কিছু অভিমত দিতে চান। একই অভিমত ব্যক্ত করলেন অন্যান্য বিচারকগণ। শুধুমাত্র নাজমুন আরা সুলতানা ছিলেন একটু ব্যতিক্রম। কারন রায় ঘোষনার ৫ দিনের মধ্যে তিনি অবসরে চলে গিয়েছিলেন।

এরপর তিনি ঠের পেয়েছিলেন প্রকাশের আগেই তাঁর লেখা খসড়া রায়টি আইনমন্ত্রী এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের কাছে চলে গিয়েছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে, আইন মন্ত্রণালয় এবং খায়রুল হকের কাছে রায়টি আসা যাওয়ার বিষয়ে আঁচ করতে পেরে কি তিনি কোন ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?

এতে কি প্রমান হয় না, সুপ্রিমকোর্টের অপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্যে সততার অভাব রয়েছে প্রকটভাবে? যারা নিজেদের ভেতরের গোপনীয়তা রক্ষা করেন না। বরং সরকারকে গোপন বিষয় অবহিত করেন তাদের দ্বারা কি ন্যায় বিচার সম্ভব! আবদুল ওয়াহাব মিঞা ছাড়া ওই বিচারপতিগণ এখনো আপিল বিভাগে কর্মরত। যারা রায়টির খসড়া সরকারে গোপনে পাঠিয়েছিলেন। এটি হচ্ছে সহকর্মীদের বিচারিক সততা নিয়ে সুরেন্দ্র কুমারের ছোট পর্যবেক্ষণ!

সবারই ষ্মরণে থাকার কথা, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার আগের দিন আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সুত্র থেকে প্রকাশ হয়ে যায়। এনিয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এবং তাঁর সহকারিকে গ্রেফতার করে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুরেন্দ্র কুমারের লেখায় কি প্রমাণ করে না বিচরকদের মাধ্যমেই আইন মন্ত্রণাল এবং সরকারের চিহ্নিত ব্যক্তিদের কাছে রায় আসা যাওয়া করে?

তিনি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন ২৭ নং চ্যাপ্টারে। এটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার পর বিচারকদের সাথে বসলেন। পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা নিয়ে সহকর্মী বিচারকদের সাথে তাঁর দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। নাজমুন আরা এসব বৈঠকে ছিলেন না। কারন ততদিনে অবসরে চলে গেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অবসরে যাওয়ার পর কারো সাথে রায় নিয়ে আলোচনা করা আইন সঙ্গত নয়। তাই নাজমুন আরার সেই সুযোগ ছিল না।

পাঠক, ১৩তম সংশোধনীর বাতিলের রায়ের বিষয়টি নিশ্চয়ই আপনাদের ষ্মরণে আছে। যে রায়ের কারনে ভোটের সার্বজনীন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। যে রায় বাংলাদেশের ভোটের গণতন্ত্রকে খাদের তলানীতে নিয়ে গেছে। দেশ আজ চরম বিপর্যয়ে।

সেটি কিন্তু দ্বিধা বিভক্ত রায় হয়েছিল। সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষনার দিন শুধু বলা হয়েছিল দ্বিধা বিভক্ত রায়ে সংখ্যা গরীষ্টের মতামতে আপিল মঞ্জুর করা হল। রায় ঘোষনার পর দেখা গেল ৩ জন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগের রায়কে সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এই ৩জন হলেন, আবদুল ওয়াহাব মিঞা, নাজমুন আরা সুলতানা ও ইমান আলী।

অপরদিকে খায়রুল হক, মোজাম্মেল হোসেন, সুরেন্দ্র কুমার ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে রায় দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছিল আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষনার সময় এই চারজন ওপেন কোর্টে ঘোষিত রায়কে পরিবর্তন করে দিলেন। যা আইনের দৃষ্ঠিতে গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত।

শুধু কি তাই! খায়রুল হক সাহেব অবসরে যাওয়ার ১৩মাস পর রায় লিখলেন। সেই রায়ে সুরেন্দ্র কুমার স্বাক্ষর করলেন। স্বাক্ষর দিয়েই শেষ নয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন খায়রুল হক দিনভর সুপ্রিমকোর্টে ছিলেন এবং সুরেন্দ্র কুমারদের সাথে বৈঠক করেছেন। অবসরে গিয়ে রায় লেখাকালীন সময়েও তিনি সুপ্রিমকোর্টে এসে সুরেন্দ্র কুমারদের সাথে একাধিকবার বৈঠক করে গেছেন, মতামত নিয়েছেন।

সুরেন্দ্র কুমারের নিজের বইয়ে উল্লেখ করেছেন নাজমুন আরা অবসরে যাওয়ার তাঁর সাথে আলোচনা করেননি। কারন এটা আইনে অ্যালাও করে না। আইন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারক রায় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন না। বেশ সুন্দর এবং আইন সম্মত কথা বলেছেন। এজন্য তাঁকে ডাবল ধন্যবাদ দেওয়া যায়।

তাঁর বয়ান অনুয়ায়ী প্রশ্ন হচ্ছে, অবসরের ১৩ মাস পর লেখা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে সুরেন্দ্র কুমার স্বাক্ষর করে কি বেআইনি কাজ করেননি?!!

প্রাসঙ্গিক আরো প্রশ্ন হচ্ছে-
ডিজিএফআই যখন তাঁকে চাপ সৃষ্টি করছিল তখন তিনি প্রধান বিচারপতি। রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির অসীম ক্ষমতা। তারপরও তিনি কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু করে জাতির সামনে বিষয়টি তখন প্রকাশ করেননি?

সেটা না করে তিনি কেন গওহর রিজভীকে বাসায় দাওয়াত করলেন। শেখ হাসিনার সাথে একটি বৈঠকের আয়োজন করে দেওয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন কেন? কেন? কেন?

গওহর রিজভীতে কাজ হচ্ছিল না। তিনি দাওয়াত করলেন ওবায়দুল কাদেরকে। ডেকে বাসায় এনে শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকের আয়োজন করে দিতে অনুরোধ করেছিলে কেন? কেন?!!

একটি ছোট ঘটনা উল্লেখ করে শেষ করব।
২০০৭ সালে জরুরী আইনের সরকার ক্ষমতায়। তখন ডিজিএফআইয়ের প্রচন্ড দাপট চলছে। যাকে-তাঁকে, যখন-তখন ডেকে নেয়া হয় ডিজিএফআই কার্যালয়ে। ওই সময় দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ছিলেন জনাব আমনুল্লাহ কবীর। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় একটি নিউজরে বিষয়ে ডিজিএফআই চরম সংক্ষুব্ধ হয়েছিল। তাঁকে ফোন করে বলার চেষ্টা করা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে সঙ্গে নিয়ে ডিজিএফআই কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি ফেনে অপরপ্রান্তের অফিসারের পদবী জানতে চাইলেন। পরিচয় জানার পর আমানুল্লাহ কবীর সাহেব প্রথমেই বলেছিলেন, আগে কথা বলার নিয়ম কানুন শিখেন। তারপর আমার সাথে কথা বলেন। একজন সম্পাদকের সাথে ফোনে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাই যারা জানে না, তাদের সাথে আবার কিসের বৈঠক! এই বলে ধমক দিয়ে তিনি ফোন রেখে দিয়েছিলেন। সেটা ঘটেছিল আমাদের সামনে।

আমার কথা হচ্ছে, একজন প্রধান বিচারপতি। যার হাতে রয়েছে অসীম ক্ষমতা। যাকে ইংরেজীতে বলা হয় ইনহেরেন্ট পাওয়ার। বিচারকদের অন্তর্নিহীত ক্ষমতা। এই ক্ষমতা থাকার পরও দফায় দফায় একজন প্রধান বিচারপতিকে ডিজিএফআই অপমান, অপদস্ত করার সাহস পায় কোথা থেকে? এই আস্কারা দেয়ার জন্য কি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাবুরা কম দায়ী?

পাঠক আপনারাই বলুন এখন দেশের ভোটের সংস্কৃতি ও বিচার বিভাগকে এই তলানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি শেখ হাসিনা একা দায়ী?? নাকি বিচার বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরাও দায়ী! এই বিষয়ে আপনাদের মতামত চাই।

বই লেখার জন্য সুরেন্দ্র কুমারকে আমরা শুধু ধন্যবাদই দিব? নাকি ন্যায় সঙ্গত প্রাসঙ্গিক বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনাও করব? ইদানিং প্রাসঙ্গিক বিষয় গুলো আলোচনা নিয়ে কিছু মানুষের গায়ে লাগে দেখতেছি। যারা আবার নিজেদের জাতীয়তাবাদী হিসাবে দাবী করেন।

 

লেখক :লন্ডনে নির্বাসিত সাংবাদিক

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার