আজকে

  • ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ৮ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

মৌলভীবাজারে বন্যা:ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা

Published: সোমবার, জুন ২৫, ২০১৮ ১১:১৪ অপরাহ্ণ    |     Modified: শুক্রবার, জুলাই ২৭, ২০১৮ ১১:০৫ অপরাহ্ণ
 

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে: বন্যার পানি দ্রুত নামছে নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে। এরই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে নতুন দুর্ভোগ। আকস্মিক বন্যায় ছেড়ে যাওয়া বাসাবাড়িতে ফিরছেন বাসিন্দারা। বসতঘর মেরামত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পর পুনরায় অনেকটা নতুন করেই যাত্রা শুরু বসবাসের। তবে হাওর এলাকায় বাড়ছে বন্যার পানি। উজানের ঢল আর ভারি বৃষ্টি হলে বন্যায় প্লাবিত হতে পারে হাওর এলাকা। এমন আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দাদের। রোববার ও সোমবার মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে থেমে থেমে রাত-দিন বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা নিয়ে হাওর পাড়ের বাসিন্দারা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ছিলেন। গেল কয়েকদিন থেকে নদী তীরবর্তী গ্রাম ও শহর এলাকা থেকে বানের পানি নামতে থাকায় ভেসে উঠছে ডুবন্ত রাস্তাঘাট আর বসতভিটা। পানি নেমে যাওয়াতে ক্ষতিগ্রস্তরা কিছুটা দুশ্চিন্তা মুক্ত হলেও এখন দেখা দিচ্ছে নানা নতুন দুর্ভোগ। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। আর এরই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানও। ঘরবাড়ি আর ক্ষেত-কৃষি হারানো দৃশ্যে অসহায়ত্বও বাড়ছে বন্যায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের। সরকারি তরফে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন বিভাগের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয়ের কাজ চলছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সবমিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে আরো ৩-৪ দিন সময় লাগতে পারে। তাছাড়া, হাওর এলাকায় বন্যা দেখা দেয় কিনা এনিয়ে স্থানীয়দের মতো তারাও উৎকণ্ঠায়। তবে জেলাজুড়ে বন্যাকবলিত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল তাদের ধারণা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে বন্যায় ৫৪ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে অনুপাতে ধারণা করা হচ্ছে জেলার ৫ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। শুধু কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর ভাঙনে ১ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক এবং পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে দেখা যায় বন্যার পানির তোড়ে বেশ কিছু ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ভিটার মাটি সরে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয়াল দৃশ্য দেখে বুঝার উপায় নেই বন্যার আগে এখানে কোনো বসতভিটা ছিল। একই অবস্থা কুলাউড়া উপজেলার মনু নদী তীরবর্তী শরীফপুর, হাজীপুর, টিলাগাঁও ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বন্যায় তাদের ঘরবাড়ির অস্তিত্ব নেই। বসতভিটা আর উঠান এখন অনেকটাই পুকুর হয়ে গেছে। এমনকি পাকা ল্যাট্রিনের ট্যাংকির নিচ পর্যন্ত পানির স্রোতের তোড়ে উঠে গেছে। নদী তীরবর্তী গ্রামের ঘরবাড়ি ঘুরে দেখা যায় সবার অবস্থা একই। কারো সীমানা প্রাচীর কিংবা ঘরের দেয়াল বানের পানির স্রোতে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এবছর আকস্মিক বন্যায় জেলার মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর প্রায় ৩০টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। বাঁধ ভাঙা এলাকার আশেপাশে যাদের বসতভিটা ছিল তাদের এখনো অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর ক্ষয়ক্ষতি। আকস্মিক বন্যায় বেহালদশা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থারও। গেল বছরের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই এবছর আবার বন্যা হওয়ায় চরম ক্ষতি হয়েছে রাস্তাঘাটের। জেলা এলজিইডি ও সওজ বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার পানির তীব্র স্রোতে অন্তত ৫শ’ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু মৌলভীবাজার পৌরসভার অধীনের রাস্তায় প্রায় ২শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পৌর মেয়র ফজলুর রহমান। বন্যায় জেলায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর আউশ ধানসহ নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সবজি ও ফলদ বাগান। ফসলের ক্ষতিতে প্রান্তিক চাষীরা এখন দিশাহারা। হঠাৎ এমন ক্ষয়ক্ষতিতে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন কৃষক। যদিও জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে নতুন করে চাষে সাহায্য করার। কিন্তু কৃষকরা বলছেন এখন আর নতুন করে আউশ ধান চাষের মৌসুম নেই। আর অন্যান্য মৌসুমি সবজিও এখন নতুন করে লাগিয়ে ফলন মিলবে না। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর জানায় তাদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চলছে। এখনো পুরোপুরি হিসাব করা যায়নি। তবে কৃষি জমির ক্ষয়ক্ষতি পঞ্চাশ কোটি টাকার উপরে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা মৎস্য বিভাগ এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চালাচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিরা জানালেন জেলায় এবারের বন্যায় কয়েক কোটি টাকার মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে। রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের মৎস্য খামারি আব্দুর রহমান জানান, তিনি ৫ লাখ টাকার মাছ চাষ করেছিলেন। কিন্তু বন্যা তা ভাসিয়ে নিয়েছে। তার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার ৪টি উপজেলার মৎস্য খামারিরা। কমলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য বিভাগ জানায় বন্যায় উপজেলার সহস্রাধিক খামারি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে সরকারি ও বেসরকারি প্রদর্শনীর খামারসহ মোট ১ হাজার ৫৫০টি পুকুর প্লাবিত হয়েছে। বিপর্যয় নেমে এসেছে পোল্ট্রি খাতেও। জেলাব্যাপী কয়েক কোটি টাকার পোল্ট্রি মোরগের খামার নষ্ট হয়েছে। বন্যায় মৌলভীবাজারের ৪টি সরকারি খাদ্য গুদামে পানি ঢুকে অন্তত ১৫ কোটি টাকার চাল এবং গম ভিজে নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা খাদ্য বিভাগ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এ জেলার ব্যবসায়ীরা। আকস্মিক বন্যায় দোকানঘরে পানি উঠায় জেলার ৪টি উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানীয় বাজারের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন। মৌলভীবাজার শহরের ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৮৪ সালের বন্যার পর মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। ঈদের ২দিন আগে থেকেই বন্যার ভয়। ১২ই জুন রাত থেকে বন্যার আশঙ্কায় শহরের বাণিজ্যিক এলাকা এম সাইফুর রহমান সড়কে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। মনু নদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকিতে পড়ায় সপ্তাহব্যাপী ওই সড়কের দু’পাশে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। সেই সঙ্গে ঈদের রাতে পৌর এলাকার বড়হাটে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সিমেন্টসহ অন্যান্য মালামালের গুদাম ও ব্যবসায়ীদের মালামাল পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। মৌলভীবাজার চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি কামাল হোসেন ও সাবেক সভাপতি ডা. এম.এ আহাদ, মৌলভীবাজার বিজনেস ফোরামের সভাপতি নুরুল ইসলাম কামরান ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন জানান, ঈদ মৌসুমে বিক্রি বন্ধ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া একটি সড়ক বন্ধ থাকা এবং ওই সড়কের ব্যবসায়ীরা বন্যার ঝুঁকিতে থাকায় মালামাল অন্যত্র সরাতে ও ভিজে যে মালামাল নষ্ট হয়েছে সে হিসাব এখনো করা সম্ভব হয়নি।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার