আজকে

  • ৩রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ১৮ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং
  • ৮ই সফর, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

তেল-গ্যাস আহরণ শয্যাশায়ী

Published: সোমবার, জুন ১১, ২০১৮ ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: সোমবার, জুন ১১, ২০১৮ ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
 

দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের কাজ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। একে তুলে ধরা ও পরিচালনা করা যে রাষ্ট্রীয় করপোরেশনের দায়িত্ব, সেই পেট্রোবাংলা কার্যত নিষ্ক্রিয়। অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বিশেষায়িত সংস্থা বাপেক্সের ক্ষমতা একদিকে সীমিত, অন্যদিকে একাধিক বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রে তাদের করা ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জ্বালানি খাত উন্নয়নের কিছু উদ্যোগ আছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ও তার অধীন বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দেশের প্রয়োজনের চেয়ে কায়েমি স্বার্থের প্রাধান্য, আমলাদের অদক্ষতা, অসন্তোষ ও হতাশায় এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ক্রমেই দুরস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সব শ্রেণির গ্রাহকেরই গ্যাসসংকট বাড়ছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম তো বিঘ্নিত হচ্ছেই, দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য রান্নাবাড়াও ব্যাহত হচ্ছে।
সাত-আট বছর ধরে দেশের জ্বালানি অনুসন্ধান ও আহরণের কাজ চলেছে ধুঁকে ধুঁকে। এই খাতে সরকার এখনো বড় কোনো সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই সময়ে দেশে গ্যাসের উত্তোলন বেড়েছে শুধুই বিদেশি কোম্পানির পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে। এর ফলে দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, যার ৫৫ শতাংশ আসছে বিদেশি কোম্পানির পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে। তা না হলে সরবরাহ আরও কমে যেত বলে মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যমান প্রায় সব ক্ষেত্রে গ্যাসের চাপ কমছে। তাই কূপগুলোয় কমপ্রেসর (ওয়েলহেড কমপ্রেসর) স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বাপেক্স ২০১৬-২১ সালের মধ্যে, অর্থাৎ পাঁচ বছরে ১০৮টি নতুন কূপ খননের অসম্ভব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যা করছে তাতে কোনো ক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস দু-এক বছরে জাতীয় গ্রিডে আসার সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে নিরুপায় সরকার প্রধানত নির্ভর করছে জ্বালানি আমদানির ওপর। কিন্তু তাতেও সংকট মিটবে না। বরং জনগণের ঘাড়ে চাপবে উচ্চমূল্যের বোঝা। রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের দুরূহ দায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন প্রতিবছর জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিও শুরু হয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের আংশিক ঘাটতি মেটাবে বলে সরকারের পূর্বাভাস। আগামী ৯ মাসের মধ্যে এলএনজি থেকে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের বিষয়টিও প্রায় নিশ্চিত। এ জন্য বর্তমান দামে এলএনজি আমদানি বাবদ প্রতিবছর ব্যয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এরপর ২০২০-২১ সাল থেকে শুরু হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি।
এত জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান কীভাবে হবে, তা নিয়ে সরকার দুশ্চিন্তায় আছে। মাঝেমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে সভা-বৈঠক হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের এই পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশিষ্ট জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশের জ্বালানিসম্পদ উন্নয়নে সাফল্য বলতে গেলে শূন্য। অন্যদিকে বেশি দামের জ্বালানি আমদানি। আবার এই বেশি দামের জ্বালানিও এনে সরবরাহ করা হবে একটি অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমে। ফলে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই উপায় দ্রুত দেশের জ্বালানিসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, বাপেক্সের ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। গ্যাসের জন্য তো যেকোনো জায়গায় কূপ খনন করলেই হয় না। আগে ভূকম্পন জরিপ করতে হয়। তারপর কূপের স্থান নির্ধারণ করতে হয়। তা ছাড়া কূপ খনন করলেই গ্যাস পাওয়া যাবে, এমনও নয়। অথচ গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো দরকার দ্রুততার সঙ্গে।
তবে দ্রুততার সঙ্গে দেশের গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ সরকারের আছে কি না জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কাছে সেই বাপেক্সের ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনার কথাই উল্লেখ করেন। অথচ এর মধ্যে এমন কোনো জায়গা প্রস্তুত করা নেই, যেখানে কূপ খনন করে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। তা ছাড়া বাপেক্সের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অর্ধেক সময় চলে গেলেও এখন পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়েছে আটটি। আরও দুটির খননকাজ চলছে। এগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত হয়েছে সামান্য। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য দেশের অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত জ্বালানি খাত এবং অত্যধিক জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থানের বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে বলেও জানান।
দেশের জ্বালানিসম্পদের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো সমুদ্রবক্ষ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ মীমাংসার পর পাঁচ বছর চলে গেছে। এখন পর্যন্ত সমুদ্রবক্ষে জ্বালানিসম্পদ অনুসন্ধান কার্যত শুরুই হয়নি। বাংলাদেশ-সংলগ্ন মিয়ানমারের এডি-৭ নামের ক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। কোরিয়ার কোম্পানি দাইউ পিএসসির অধীনে সেই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস তুলছে। ওই ক্ষেত্রের সংলগ্ন বাংলাদেশের একটি গ্যাস ব্লক হচ্ছে ডিএস-১২। এই ক্ষেত্রটি উন্নয়নের জন্য দাইউর সঙ্গে সরকার উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) করেছে। কিন্তু তারা এখনো উন্নয়নকাজ শুরু করেনি। মিয়ানমারের গ্যাস তোলার কাজেই ব্যস্ত বেশি।
দেশের ভূতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, মিয়ানমারের এডি-৭ এবং বাংলাদেশের ডিএস-১২ ব্লক দুটি জুড়ে গ্যাসের একটি অভিন্ন কাঠামো রয়েছে। ফলে মিয়ানমার যে গ্যাস তুলছে সেখানে বাংলাদেশের অংশের গ্যাসও চলে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, স্থলভাগে এবং সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যে উদ্যোগ ও তৎপরতা থাকা দরকার, তা নেই। এ কারণেই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু দেশের জ্বালানি খাতের জন্য এই নির্ভরতা ভালো নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার