আজকে

  • ৫ই ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২০শে আগস্ট, ২০১৮ ইং
  • ৮ই জিলহজ্জ, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

মেগান মার্কেল কি ডায়ানার পথে হাঁটবেন?

Published: সোমবার, মে ২৮, ২০১৮ ৮:৫৪ অপরাহ্ণ    |     Modified: সোমবার, জুন ১১, ২০১৮ ২:১৭ অপরাহ্ণ
 

অর্ণব সান্যাল:

ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম তরুণ সদস্য প্রিন্স হ্যারির বিয়ে হয়ে গেল হলিউড অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের সঙ্গে। এ নিয়ে সারা বিশ্বে বেশ উন্মাদনাও দেখা গেল। কিন্তু মেগান ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন কি? ব্রিটিশ রাজপরিবারের কঠোর বিধিনিষেধের সঙ্গে সাধারণ শ্রেণি-পেশার একজন মানুষের মানিয়ে নেওয়া সত্যিই কঠিন। অন্তত নিকট অতীতের বিভিন্ন ঘটনা তা-ই বলে।

রাজা-রাজড়াদের কাছে বিয়ে খুব প্রয়োজনীয় একটি অনুষ্ঠান। শুধু উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেখনদারির বিষয়টিও। কারণ, বর্তমান বিশ্বে রাজপরিবারের কর্তৃত্বের বিষয়টি অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তাই রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান, রাজপরিবারের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার একটি মোক্ষম সুযোগ। সাধারণত, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা অভিজাত বংশের ব্রিটিশদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে গত শতাব্দী থেকে এই কৌশলে বেশ বড়সড় ধাক্কা লাগে। সৃষ্টি হয়েছিল দুটি সংকট। ১৯৩৬ সালে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড যখন ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করতে রাজমুকুট ছুড়ে ফেললেন, তখন প্রথমবারের মতো কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের ভিত। এর পরের সংকটটি নিয়ে আসেন প্রিন্স চার্লস, ডায়ানা স্পেনসারকে বিয়ে করে।

ওপরের এই দুটি ঘটনা, ব্রিটিশ রাজপরিবারের পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। প্রেমের জন্য রাজকীয় প্রথাও যে লঙ্ঘনযোগ্য—সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়। গত শনিবার হ্যারি-মেগানের বিয়েও কিন্তু সেই প্রথা ভাঙার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে ৩৩ বছর বয়সী বর ও ৩৬ বছর বয়সী কনেকে দম্পতি ঘোষণা করেন ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি। উপস্থিত ছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্স চার্লস এবং আরও ৬০০ অতিথি। বিয়ের অনুষ্ঠানজুড়ে আধুনিকতা ও হাজার বছরের পুরোনো রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী প্রথার মিশেল স্পষ্টই চোখে পড়েছে। স্বামীর শতভাগ বাধ্য থাকার শপথ নেননি মেগান। অন্যদিকে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো পুরুষ যা আগে করেননি, তাই করেছেন প্রিন্স হ্যারি। তিনি আঙুলে নিয়েছেন বিয়ের আংটি।

 

বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনায় হয়তো শিক্ষা নিয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবার। সাধারণ মানুষের বিরাগভাজন হওয়ার মতো কোনো কাজ করতে চায় না তাঁরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর রানির শাসন হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। ওই সময় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়েছিল রাজপরিবার। সাবেক পুত্রবধূর মৃত্যুতে নির্বিকার থাকায় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ওপর ব্রিটিশ জনগণের সমর্থন কমে যায় অনেকখানি।

তবে রানির সেই আচরণ এখন অনেকেই ভুলে গেছেন। যখন তিনি রাজমুকুট পেয়েছিলেন, তখন সেখানে ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারপ্রধান উইনস্টন চার্চিল ও মার্কিন সরকারপ্রধান হ্যারি এস ট্রুম্যান। এ কারণে অনেক দিন ধরেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ওপর একধরনের নির্ভরতা খুঁজে পায় যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনগণ। তাদের কাছে অস্থির সময়ে নির্ভরতার প্রতীক হলেন ৯২ বছর বয়সী রানি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাঁর মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে উচ্চবাচ্য না হলেও তা নিয়ে একধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়েই গেছে।

রাজপরিবারের রাজনীতি
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর কে রাজমুকুট পরবেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে বহুদিন ধরেই। সাধারণভাবে প্রিন্স চার্লসের রাজা হওয়ার কথা। তবে জনপ্রিয়তার বিচারে দুই ছেলের চেয়ে ঢের পিছিয়ে তিনি। আর এখানেও আছে মৃত প্রিন্সেসের প্রভাব। মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যাননি ডায়ানা স্পেনসার। মায়ের প্রতি দুই ছেলের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সাধারণ ব্রিটিশরা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তাই প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারির জনপ্রিয়তাও বেশি।

গত বছর ইউগভ পোলের করা একটি জরিপে দেখা গেছে, চার্লসের ইতিবাচক রেটিং মাত্র ৪ শতাংশ। চার্লসের দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যামিলা পার্কারের নেতিবাচক রেটিং প্রায় ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে, উইলিয়াম ও হ্যারির প্রতি মানুষের সমর্থন অনেক বেশি। জনপ্রিয়তার বিচারে তাঁদের রেটিং ৬০ শতাংশের ওপরে। এই জরিপে যত মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের অর্ধেকই মনে করেন, রানির মৃত্যুর পর রাজা হওয়ার সুযোগ্য প্রার্থী হলেন ডায়ানার বড় ছেলে উইলিয়াম।

দ্য টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জীবিত ডায়ানা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করে বলেছিলেন, চার্লস তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। ডায়ানার অভিযোগ ছিল, বিয়েতে দুজন নয়, ছিলেন তিনজন। আর এটিই বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। ডায়ানার মৃত্যুর পর ‘অবিশ্বস্ত স্বামী’র তকমা পেয়েছিলেন চার্লস। সেই থেকে ‘ভিলেন’ হয়েছেন চার্লস। আর ধীরে ধীরে ডায়ানার প্রতি মানুষের অফুরান ভালোবাসা ঘুরে গেছে তাঁর দুই ছেলের দিকে।

তবে নিয়ম অনুযায়ী রাজমুকুট পাওয়ার কথা চার্লসেরই। বর্তমানে রানির কিছু রাজকীয় দায়িত্বও তিনি পালন করছেন। বেশি বয়স হওয়ায় রানি এখন আর দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ করতে পারেন না। তাই রাজকীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সামনে আনা হচ্ছে চার্লসকে। কিন্তু নাক উঁচু স্বভাবের কারণে চার্লসের সমালোচনাও অনেক। আধুনিক রাজপরিবারগুলো রাজনীতি থেকে সব সময় দূরে থাকার চেষ্টা করে। সেই দিকেও ব্যর্থ প্রিন্স চার্লস। যুক্তরাজ্যের সরকার ও সরকারের বাইরে—এই দুই পক্ষেই শত্রু আছে চার্লসের।

রানির মৃত্যুর পরদিনই রাজা ঘোষিত হওয়ার কথা চার্লসের। সেদিনই জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তাঁকে। কারণ, রাজপরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী ওই দিনই নিজের রানির নাম ঘোষণা করতে হবে চার্লসকে। রাজপরিবারের ইতিহাসবিদ রবার্ট ল্যাসি বলেন, ‘যদি তিনি ক্যামিলাকে রানির আসনে বসান, তবে এটি তাঁর রাজত্ব ধ্বংস করে দিতে পারে।’

মেগান কি আশীর্বাদ?
মেগান মার্কেল মিশ্রবর্ণের। তাঁর বাবা টমাস মার্কেল একজন শ্বেতাঙ্গ। মা ডোরিয়া রাগল্যান্ড কৃষ্ণাঙ্গ। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে এই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি মেগানের বাবা। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দাশ্রু দেখা গেছে ডোরিয়ার চোখে।

শুধু গায়ের রঙের কারণে মেগানকে অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। মার্কিন সমাজে ১৯৮০-এর দশকে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের বিয়েকে খুব একটা স্বাভাবিকভাবে দেখা হতো না। ২০১৫ সালে এলি ম্যাগাজিনে এক নিবন্ধে মেগান লিখেছিলেন, যাতে শিশু মেগানকে গঞ্জনা সহ্য করতে না হয়, সেই জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেননি বাবা টমাস। আবার বিনোদন জগতে পা রাখার পরও খোঁটা শুনতে হয়েছে এই হলিউড অভিনেত্রীকে। অনেক সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মেগান। এ নিয়ে নিজের ব্লগে লিখেছেনও তিনি। ১০ বছর মেগানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা নিক কলিন্স জানিয়েছেন, অনেক বাধা ও প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েও টলে যাননি মেগান। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

দ্য টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ রাজপরিবার অন্যান্য রাজপরিবার থেকে একেবারেই আলাদা। নিয়মকানুনের এমনই বহর যে পদমর্যাদা অনুযায়ী কক্ষে কে আগে ঢুকবে, তাও ঠিক করা আছে। এমন একটি পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে মেগানের টিকে থাকা বেশ কষ্টকর। এর আগে যাঁরা বাইরের লোক হিসেবে এই পরিবারের সদস্য হয়েছিলেন, তাঁরা সবাই সেখানে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলেন। রাজপরিবার এখন আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে দাবার ঘুঁটি হতে পারেন হ্যারি-মেগান। এরই মধ্যে কমনওয়েলথের যুব দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেগানও তাঁর সব বক্তব্যে টেনে আনছেন এই সংস্থাকে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মেগান আসায় সাধারণ নাগরিকেরা এখন রাজপরিবারের মধ্যে নিজেদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। তাঁকে ছাড়া ব্রিটিশ রাজপরিবারকে একটি অদ্ভুত প্রজাতি বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্রিটিশ জাতিকে একতাবদ্ধ করার একটি বড় সুযোগ এটি। সবচেয়ে বড় সুবিধা পাওয়া যাবে রাজনীতিতে। কারণ, মেগানের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। ১১ বছর বয়স থেকেই নারীবাদী হিসেবে গড়ে উঠেছেন তিনি। নারীর অধিকার নিয়ে বরাবরই সোচ্চার এই মার্কিন অভিনেত্রী। এ নিয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘেও। ‘#মিটু’ আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগ থেকেই কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নিয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন মেগান। এসব কারণে দাতব্য কাজকর্মে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মেগান মার্কেল উপযুক্ত ব্যক্তি।

রাজপরিবারের ওপর কূটনৈতিক কিছু দায়িত্বও চাপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এর মূল কারণ হলো, রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা কূটনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক হন না। সেদিক থেকে আবার মেগানের সুখ্যাতি নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যেই ‘নারীবিদ্বেষী’ বলে গালমন্দ করেছেন মেগান। আবার রুয়ান্ডার একনায়ক পল কাগামের প্রতি নরম মেগান। কারণ, রুয়ান্ডার পার্লামেন্টে অনেক নারীকে সদস্যপদ দিয়েছেন তিনি! রাজবধূ হওয়ার পর অবশ্য এভাবে কথা বলার স্বাধীনতা পাবেন না মেগান। আর তাতেই হতে পারে সমস্যা। কারণ, বিতর্ক তৈরি করার স্বাভাবিক প্রবণতা আছে মেগানের।

দ্য টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য এই নতুন সদস্যরা একদিক থেকে বিপজ্জনক, অন্যদিকে প্রয়োজনীয়। প্রতিটি নাটকে একই অভিনেতা-অভিনেত্রী দেখতে পছন্দ দর্শকদের। তেমনই রাজপরিবারেও চাই নতুন মুখ। এই নতুনেরা যদি ক্যামিলা পার্কারের মতো অজনপ্রিয় হন, তবে পুরো রাজপরিবারের ওপরই তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। আবার তাঁরা যদি ডায়ানার মতো ব্যাপক জনপ্রিয় হন, তবেও ক্ষতি হয় রাজপরিবারের। কারণ, সাধারণের মনোযোগ তখন রাজপরিবার থেকে সরে যায়।

মেগান মার্কেল কখনোই ডায়ানা স্পেনসার হতে পারবেন না। কারণ, ডায়ানার মতো বেপরোয়া স্বভাব নেই মেগানের। তবে হ্যাঁ, রাজপরিবারের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ ধরে রাখতে পারবেন তিনি। জীবনের কঠিন সংগ্রাম মোকাবিলা করে আসায় মেগানের সহজে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম। যদি মেগানকে নিজের মতো করে চলার সুযোগ দেয় রাজপরিবার, তবেই জনপ্রিয়তা বাড়বে রাজবধূর। উপকার হবে রাজপরিবারেরও। আর যদি রাজপরিবার মেগানের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চায়, তবে বিরোধ অনিবার্য। তখন হয়তো রাজপরিবারের চক্ষুশূলে পরিণত হবেন মেগান মার্কেল, যেমনটা হয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ি।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার