আজকে

  • ১লা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ১৬ই আগস্ট, ২০১৮ ইং
  • ৪ঠা জিলহজ্জ, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

কালো কফি ও আগুন লাগা মুহূর্ত…

Published: সোমবার, এপ্রিল ২৩, ২০১৮ ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: সোমবার, এপ্রিল ২৩, ২০১৮ ১২:২২ অপরাহ্ণ
 

আহমদ ময়েজ:

তার উষ্ণ করতলে কয়েকটা শুঁয়োপোকা বাসা বেঁধেছে।  সে জানে কোনটি দরকার আর কোনটি নয়।  তবে এ মুহূর্তে সবক’টিকেই পুষে রাখতে চায় সহজাত বিভ্রম দিয়ে, শিকল পরিয়ে।

তার নাম মিতালী। যে অর্থে মিতালী শব্দ বন্ধুত্বের সেতু নির্মাণ করে-যা কেবল কিছু ধ্বনির ভেতর থেকে বার বার উৎসারিত হতে হতে মিলিয়ে যায়; সেইটুকু আশ্রয় করেই সে নিজের মহত্বকে বড় করে দেখার চেষ্টা করে মাত্র। কেবল যে মহৎশব্দ উচ্চারিত হলেই মানব হৃদয় বিকশিত হয় না – এ ধরণের কোনো স্রোতধারা তার মস্তিষ্কে আবর্তিত হয়নি বলেই বিষাক্ত জেনেও সে শুঁয়োপোকাগুলোকে পোষে রাখতে চায়।

শুঁয়োপোকা তিনটির নাম ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন-বুদ্ধিতে সৌকর্য, গিলান মরমি-মাথায় চাষ করে মথুরার গান এবং আতর আলী-বানিজ্যিক চাতুর্য কতটা ধরে রাখতে পারল সেই চিন্তায় সার্বক্ষণিক থাকে অস্থির।

এটা কেন বিভ্রম হবে – প্রশ্ন উত্থাপন হওয়াই স্বাভাবিক? এ ধরণের শব্দ দ্বারা মিতালিকে চিহ্নিত করা হলে কতটা অবিচার হবে সেভাবনাগুলো আতর আলীকে কাহিল করে।  তবু ভুলে কিংবা অবচেতন মনে মিতালির জন্য অনাকাঙ্খিত এই শব্দটি এ তিনের মধ্য হতে যে কারও মুখ থেকে অনুসৃত হয়েছে – যা কেউ আর এখন স্বীকার করতে রাজি নয়।  নাকি চতুর্থ কোনো পক্ষ থেকে এর বিস্তার ঘটেছে হলফ করে বলা যাবে না।

ওরা এক ঘোরলাগা সময় পার করছে-বিলেতের এই পুরাণ নগরীর ত্রিকোণ থেকে ত্রিভুজের মতো অবস্থান করে।  ত্রিভুজের মধ্যভাগ থেকে যে রমণীটি কুপিলেমের সলতের মতো সবাইকে অবলোকন করছে আলোর বিভায় – সেই মিতালির নামে প্রত্যেকের ঝোলায় ক’ডজন কবিতাও ইতোমধ্যে জমা হয়ে গেছে।  অর্থাৎ এই বহমানকালে তারা প্রত্যেকেই কমবেশি কবিতা ধারণ করেন, কবিতার তরঙ্গ ও দেহসৌরভ বেষ্টিত আবেশে নিমগ্ন থাকেন।  আর যোগাযোগটা এই আধুনিককালের শব্দতরঙ্গ বহনকারী টেলিফোনটা প্রত্যেকের প্রধান বাহন। মিতালির মন খারাপ হলে, নগরের ত্রিকোন পুড়ে যায়।মিতালী ঋতুবতী হলে, নগরীতে জ্বর আসে – কালা জ্বর, হলুদ জ্বর।  তখন এক সঙ্গে তিনটি ফোন বেজে ওঠে-কার আগে কে খবরটি চাউর করবে কান থেকে কানে, মন থেকে মনে।  আর তখন বোরাখের গতি নিয়ে ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন মহাসড়ক অতিক্রম করে, শহর-নগর তসনস করে, জোগাড় করতে চায় একটু সঞ্জীবনী দাওয়াই।  গিলান মরমি নিমাই নিমাই বলে প্রার্থনা করে ঈশ্বরের কাছে।  আতর আলী সমুদ্র মন্থন করে তুলে আনতে চায় একফোটা কোরামিন – হৃৎস্পন্দের দাওয়াই।

আতর আলী ভাবে – আমার ঔষধই সেরা।  ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন ভাবে – ওসব নস্যি, এই তো মিতালীর কানে তুলে দিলাম শব্দের ধুন-যাতে মনোবিকারগ্রস্ত থেকে সে ফিরে এসে এখনই সবুজ হয়ে উঠবে।  গিলান মরমি অঝোর ধারায় কাঁদে।  তার অশ্রুপাতে ঈশ্বর নড়ে উঠেন।  এভাবে একটি ইন্দ্রজালের ভেতর থেকে, তিনটি প্রাণের ভেতর এক-সঙ্গে একটি স্রোতাধারা বইতে থাকে।

এই তিন পুরুষ কোনো না কোনোভাবে কিছুটা হলেও লেখক সত্ত্বা ধারণ করেন বলে মিতালিকে একজন শব্দ মিস্ত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। সে জানে কোন শব্দের ভেতর কতটা আরক-ধ্বনি-ধুপ মিশানো গেলে হিমালয়ের উঁচু চুড়াটিকে গঙ্গাধারা ভাবা যায়-গঙ্গা হয়ে ওঠে হিমালয়।

এক মধ্যরাতে মিতালী ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিনের কাছে একটি নদীর নূপুর ভিক্ষা প্রার্থনা করেছিল।  জয়েনুদ্দিন তখন ছিল অন্য এক জগতের বাসিন্দা। তার মনে হয়েছিল নিক্কণের একটা জলতরঙ্গ নৃত্য করে করে বুকের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।  নূপুর ধ্বনিটা ধরতে-ধরতে মগজ থেকে ফসকে যায়।

: হ্যারে দেবী, তুই কী চাইলি-আর একবার বল, আমাকে অনুগ্রহ কর।

: হায় ঈশ্বর – তুমি আমাকে দেবী বানিয়েছো।  তুমি এতো বড়! এতো মহত! আমাকে এবার একটা নদীর নূপুর বানিয়ে দাও।  আমি বাজাবো ঈশ্বর, তোমাকেই বাজাবো।

ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিনের কাছে এই মধ্যরাত রাত আর কেবল রাত থাকে না – প্রাগৈতিহাসিক থেকে ওঠে আসা মহাকালের একটি অংশ হয়ে ওঠে।  এই অংশের মধ্যভাগচিত্রে ক্যানভাস ভরাট করে জায়নামাজের মতো ছড়িয়ে আছে মিতালীর দীর্ঘ কালো চুল।  জয়েনুদ্দিন টিপায়ার উপর পান-পাত্রটি টুক করে রেখে দিয়ে উপুড় হয়ে জায়নামাজটির দিকে হাত বাড়ায়।  হাতের কম্পন কিছুটা টের পেলে, দৃঢ়ভাবে মুঠোকে শক্ত করে।  মুহূর্তটাকে ধারণ করতে, অমর করতে সচেষ্ট হয় ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন।  এভাবে মধ্যরাতের শেষ সময়টুকু জুড়ে মিতালির টেলিফোনের তারের ভেতর বাঁধা পড়ে থাকে ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন।  গিলান মরমি এই সময়টুকু নাইট শিফটের কাজ শেষে একটু অবসর পায়।  সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে বাথরুমে ঢুকে।  গিলান মরমি বরাবরই শান্ত-শিষ্ট-ধীর চিন্তার মানুষ।  কবি হলেও তার ভিতরের ঝড় বাইরে প্রকাশ পায় না।  নিজেকে সে ভদ্রলোকের ন্যায় গুটিয়ে রাখার স্মার্ট কৌশলটা আয়ত্ব করতে পেরেছে, দীর্ঘদিনের কসরতে। গিলান মরমি বাথরুমে ঢুকে টেপ থেকে পানি ছাড়ে।  নিজের ঘর্মাক্ত-ক্লান্ত মুখটা আয়নার সামনে তুলে ধরে। ডান-বাম করে ঘাড়টা আলতো করে দেখে নেয়।  তারপর আস্তে-ধীরে পানির ঝাপটায় মুখটা ভিজিয়ে নিয়ে অনেকক্ষণ বকের মতো ঝিম মেরে যখন দাঁড়িয়ে থাকে-তখন কুয়াশার চাদর বিছিয়ে ওয়েলসের পাহাড়গুলোতে ঠাণ্ডা নেমে আসে।  ডলগালুর নিভৃতপল্লীর কিষানী মেয়েরা যখন ক্লাবঘর সরগরম করে ক্লান্ত-গিলান মরমি সে-সময় একটা দুধ-সাদা টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রেস্টুরেন্টের বারের সামনে এসে দাঁড়ায়।খুব যত্ন করে একটি ব্ল্যাক কফি বানায়।একটি পোড়া পোড়া গন্ধ মৌ মৌ করে ছড়িয়ে পড়ে ঘরময়।  শূন্য একটি চেয়ারে বসে ধ্যানমগ্নের মতো কড়া কফিটার দিকে চেয়ে থাকে।  কী দেখছে সে জানে না তবে তার ইন্দ্রীয় বলছে, একটি মায়াময় মুখ এক্যুরিয়ামের মাছের মতো সাঁতার কাটছে কালো কফির ভেতর।  গিলান মরমি কফিতে আস্তে করে চুমুক দেয়।  তার অন্য সহকার্মীরা যখন রেস্টুরেন্টের উপরে শুয়ে থাকতে ব্যস্ত সে তখন কফিতে চুমুক দেয়ার ফাঁকে মুঠোফোনটা নাড়াচাড়া করে।  ফোনটার দিকে তাকাতে-তাকাতে হাড়ের এই শব্দ-যন্ত্রটির প্রতি যথেষ্ট বিরক্ত বোধ করে।  কাজের ফাঁকে মিতালিকে দু’টো টেক্সটবার্তা পাঠিয়েছে। লাভ হয়নি। ও প্রান্ত একেবারে নীরব।  শেষে ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিনকে চেষ্টা করে দেখেছে – ও লাইনও ব্যস্ত।  বিরক্তিটুকু চাপা রেখে শেষবারের মতো মিতালিকে চেষ্টা করে ধরার। এবার গিলান মরমির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সামর্থ হয়। ও প্রান্তের ফোন বুঝি নড়ে-চড়ে উঠল।  আনন্দের হিল্লোল তুলে সে কফির পেয়ালাটা উজাড় করে।  ঘন ঘন স্ক্রিনের দিকে তাকায়-পাল্টা রিপ্লাই পাবার আশায়। তার ফোনটা হেসে উঠার আগ পর্যন্ত সময়টুকু এক অনন্তকাল বলে মনে হয়।

আতর আলী দিনের চব্বিশ ঘন্টা সময়কে তিনভাগ করে দেখেছে-মিতালির কাছে তার জন্য বরাদ্দকৃত সময়টুকু মাত্র ত্রিশ মিনিট।  সে খুব মনোক্ষুন্ন হলেও সন্তুষ্ট থাকে এই ভেবে যে, অন্ততঃ দিনে একবার হলেও মিতালির সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য তন্ময়-সময় কাটে। ঐ মুহূর্তটা আতর আলী আতরের একটা গন্ধ ছড়িয়ে, চোখে সুরমার প্রলেপ টেনে আরব্য রজনীর একশ’ একটি রাত্রির টান টান কম্পনকে বুকের পিঞ্জিরায় পোষে রাখে।  আতর আলী গিলাম মরমিকে হিংসা করে-যার সুন্দরী বৌয়ের চেয়ে, অসংখ্য বান্ধবীর চেয়ে, সরচিত কয়েকটি মায়াময় গ্রন্থ রয়েছে।  আতর আলী ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিনকেও হিংসা করে – যার বিশাল একটি হৃদয়, যে হৃদয়ের তিনভাগ জুড়ে কালসিটে নিকোটিনের দাগ নিয়েও ভরা প্রাচুর্যের ন্যায় ঢেউ তুলতে পারে।  আতর আলীর বানিজ্যিক চাতুর্যতার ভেতরও এইসব সুক্ষন্ন অনুভূতি আজকাল একটু একটু করে ধরা দিতে চাচ্ছে – প্রশস্ত হতে শুরু করেছে চিন্তার তরঙ্গগুলো।  কিন্তু এই তরঙ্গগুলোর গিট্টু কোনো কোনো সময় ধাতুর মতো কঠিন-কঠিন লাগে।  এসব চিন্তার গিট্টু কী করে খোলে, কী করে বিন্যস্ত করতে হয়-তার বোধে ধরা দিতে চায় না সহজে। একটা ছাড়া ছাড়া-মেঘছেড়া-সূতোর ন্যায় চিন্তাগুলো দূর-বহুদূর দিয়ে বয়ে যেতে থাকে।  তখন আর কাউকে স্মরণে আনতে চায় না আতর আলী।  না মিতালি, না ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন, না গিলান মরমি -একেকজনকে কচ্ছপ বা শামুক জাতীয় কিছু একটা মনে হতে থাকে।  তার ওল্ড-গে্টইর তান্দুরি রেস্টুরেন্টের চায়নিজ মেয়েটার চোখের মতো বোধহীন মনে হয়।  এই মেয়ে শামুক খায়, কচ্ছপ খায় আরও যা যা খায় এর জন্য আতর আলীর কিছু যায় আসে না। কিন্তু ইদানিং বন্ধুদের শামুক এবং কচ্ছপের মতো মনে হওয়াতে এই মেয়েটিকেও তার কাছে সাংহাইর জলের মতো অচেনা মনে হয়।  আতর আলীর এমত অবস্থা আর কতদিন চলতে পারতো ভাববার আগেই নিজের জন্য অন্য এক উপাখ্যান তৈরি করে নেয় মিতালি।

মিতালির কাছ থেকে যে নিক্কণের সুর ধরতে চেয়েছিল ভ্ল্যাদিমির জয়েনুদ্দিন, যে মুগ্ধতার মায়াময় শ্লোক তুলে রেখেছিল আতর আলী – একদিন কার্ত্তিকের পোড়া চাঁদ গ্রাস করে ঘোরলাগা সকল আয়োজন।  বিলেতের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়ায় মিতালির জন্য অন্য এক উপাখ্যান রচিত হতে থাকে, গিলান মরমির ডেফোলিডের মাঠে।  এমন একটি উপচারই মিতালির জন্য সবচে স্বস্তিদায়ক ছিল।

*তাৎক্ষণিক সংক্ষিপ্ত পাঠপ্রতিক্রিয়া:কাইয়ূম আবদুল্লাহ

একটি ঘোরলাগা আবহ নিয়ে গল্পটি পড়া শেষ হলো। বলা যায়, গল্পের সূচনাতেই সেই ঘোর এসে ভর করে। যদিও আমি “ভ্লাদিমির জয়নুদ্দিন কিংবা “গিলান মরমি”দের মতো বুদ্ধি ও ভাবের মহারতি নই। তবু এক আজানা ও অনেকটা অলৌকিক ভাব সায়রের ঢেউ আমাকে টেনে নিয়ে যায়। আমি পুরোটা ডুবে যাই তাদের সাথে। আর আচ্ছন্ন হয়ে ক্রমশ তলাতে থাকি গভীর থেকে গভীরে, অন্য ভূবনে। ঘোর কাটতেই মনে হলো (হয়তো আমার ভ্রম হতে পারে) ‘গিলান মরমি’ মরমির মুখোশ খুলে মুচকি হাসছেন একজন আহমদ ময়েজ। আর অদূরে ডেফোডিল বনে বসে ভেজা শাড়ি শুকোচ্ছেন অধরা ‘মিতালী’।

আমরা সরাচর যেসব গল্প পড়ি সেগুলোতে থাকে সাধারণত কিছু কমন চিত্রপট ও ডায়লগ। কিন্তু এই গল্পে সেসবের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেই দিক থেকে এটি ব্যতিক্রম ও আলাদা।

আমি নিশ্চিত যে, গল্পে বর্ণিত কালো কফির নিকোটিন গিলে গিলে এক পরাবাস্তব জগতের অনন্য সুখ খুঁজে পাবেন ভাবুক-বিদগ্ধজন।

লেখককে স্যালুট!

 

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার

    আগষ্ট ২০১৮
    রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
    « জুলাই    
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১