আজকে

  • ১০ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৪শে জুন, ২০১৮ ইং
  • ৯ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

স্বজনের জন্য খোলা থাকুক বন্ধুত্বের দুয়ার

Published: বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৯, ২০১৮ ৭:২৯ অপরাহ্ণ    |     Modified: শনিবার, এপ্রিল ২১, ২০১৮ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
 
শাহনাজ সুলতানা:
আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি অনেকে তার পরিচিত ব্যক্তিকে বন্ধু বলে পরিচয় দেন। যেমন কোন অ-পরিচিত ব্যক্তির সাথে পরিচয় হল বা পরিচিত কোন ব্যক্তির সঙ্গে মাঝে মধ্যে অথবা প্রায়ই কথা-বার্তা হল। দেখা সাক্ষাত হল। কিন্তু তাই বলে কী ঐ ব্যক্তি বন্ধু হয়ে গেলেন? আমাদের তা মনে হয় না। সত্যিকার অর্থে বন্ধু শব্দের অর্থ কি, বন্ধুত্ব কেমন করে হয়? বন্ধুত্বের কী এমন রঙ থাকে। যদি থাকে তা হলে সে রঙ সাদা, কালো, নীল না বাদামী? বন্ধুত্ব কী আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে তৈরী করতে হয়, না এটা নিজ থেকেই তৈরী হয়ে যায়। অনেকের বেলায় এই প্রশ্নগুলোর হিসেব মিলানো বেশ কঠিন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বন্ধু নির্বাচন বা প্রকৃত বন্ধুর স্বার্থহীন হাতছানি বুঝে নিতে মোটেও কষ্টকর হয়না। যারা প্রকৃত বন্ধু নির্বাচনে ভুল করে। আবেগের কাছে হার মেনে অপরের সাজানো কথায় মরুভুমির বুকে একফোঁটা বৃষ্টির মত অমৃত সুধার মনে করে, না-জেনে, না-বুঝে বন্ধুত্বে হাত বাড়ায়। তারাই কিন্তু প্রতারণার স্বীকার ও ধোঁকায় পড়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। তাদের বিশ্বাসের আয়নায় এমন ভাবে মরীচিকা পড়ে যাতে নতুন বা পরিচিত কোন ব্যক্তির চেহারা তো দূরের কথা মুখের আদলও ষ্পষ্টভাবে দেখা যায়না। তাদের হৃদয়ের আকুতি, ভালোবাসার আর্তি শাদা কাফনে এমন ভাবে ঢাকা পড়ে যেখানে নতুন কারো প্রবেশাধিকার দূরের কথা। পরিচিতজনের সাথেও ঘনিষ্টভাবে মেলামেশার আগ্রহটুকু হারিয়ে ফেলে। অবশেষে ভুলের মাশুল হিসেবে বুকবন্দি প্রতারণা আর দীর্ঘশ্বাসই হয় বাকি জীবনের সঙ্গী।
স্বার্থহীন ব্যক্তিকে যারা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে তারা কিন্তু জীবনে পরাজিত হন না। কারণ, তারা জানে প্রকৃত বন্ধু বসন্তে কোকিল ডাকলে বা আকাশে কালো মেঘের পরিন্দা উড়ে গিয়ে রোদ্রের ঝলক উঁকি দিলে অথবা কষ্টের দিন সীমানা পেরিয়ে চলে গেলেও বন্ধুর চোখের রঙ বা কথা বলার বচন-ভঙ্গি, চাওয়া পাওয়ার আগ্রহ মরে না। আর এ জন্যই এরিষ্টটল বলেছেন–‘বন্ধু হচ্ছে- দুটি দেহের মধ্যে এক আত্মার বাস।’ আর সেটা একজন প্রকৃত বন্ধু তার নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। রঙহীন, স্বার্থহীন ভাবে বন্ধুত্ব তৈরী হয় সেটাই খাঁটি বন্ধুত্ব। অনেকের মতে, একজন ভালো বন্ধু আছে যার তার মতো ভাগ্যবান আর কেউ হয় না। তবে প্রশ্ন হলো, এ কথা সব বন্ধুর বেলায় কি প্রযোজ্য? আমার মনে হয় সবার ক্ষেত্রে এ বাক্যটি প্রয়োগ করা যাবে না। শুধুমাত্র তাদের বেলায় প্রয়োগ করা যাবে যারা লোভ লালসার উর্ধ্বে বন্ধুকে লালন এবং ধারণ করেন। বন্ধুত্ব কখনও টাকা, পয়সা, ধন-সম্পদ আর কাঁচা মাংসের লোভে তৈরী হয় না। এটা নিজ থেকেই তৈরী হয়ে যায়। একটা অদৃশ্য টানে, সফেদ ভালোলাগার মাধ্যমে বন্ধৃত্বের চারাগাছ জন্মায়। হেনরি এডামস ও একই কথা বলেছেন—‘বন্ধু কখনো তৈরি হয় না, জন্ম নেয়।’ যে বন্ধু নিজ স্বার্থে বন্ধুকে এভ্য়েড করে, সুযোগ বুঝে ডাষ্টবিনে ছুড়ে দেয় এবং তার অবদান অস্বীকার করে সে কখন বন্ধুর আওতায় পড়েনা। প্রস্তুতি নিয়ে যারা বন্ধুত্বে হাত বাড়ায়, তারা স্বার্থপর এবং অনেকটা অমাবশ্যার মতো ক্ষণস্থায়ী, যা ভোর হবার পূর্বেই আকাশে মিলিয়ে যায়। এ জাতীয় মনোভাবের বন্ধু কোন সময়ই সৎ মানুষেরর অন্তরে দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না। বন্ধুত্ব একটা পবিত্র বন্ধন। এই সোনালি বন্ধনে আবদ্ধ। কষ্ট পাবার তো কথা নয়। যেখানে এক বন্ধুর কষ্ট, দুঃখ ও বেদনায় অন্য বন্ধুর হৃদয়ে হাহাকার ও রক্তক্ষরণের কথা। সেখানে দেখেছি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাজে বেদনার সুর আর বিদ্রুপ হাসির ঝংকার। ইসাবেলা নরটন তার জীবদ্দশায় বলেছিলেন,—‘বন্ধুর মধ্যে তুমি খুঁজে পাবে দ্বিতীয় জীবন।’ এ কথার রেশ ধরে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায় সেটা হল- সত্যিকার অর্থে বাস্তবে ক’জন বন্ধু খুঁজে পান তার অপর বন্ধুর মধ্যে দ্বিতীয় জীবন? খোঁজ নিলে হয়তো হাজারের মধ্যে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন পাওয়া যাবে। তবে ইসাবেলা নরটনের কথা মনোযোগ দিয়ে পড়লে আমরা বুঝতে পারি তিনি কিন্তু সব বন্ধুর কথা বলেননি, বলেছেন যাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে খাঁটি বন্ধুত্বের শক্ত বন্ধন রয়েছে।

সুতরাং বন্ধু কেমন হওয়া চাই? বন্ধু হিসেবে কাকে গ্রহণ করা যায়, কোন ধরণের মানুষের ডাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটা নির্ভর করে একান্ত নিজের উপর। না-জেনে না-বুঝে শুধু মুখের কথা বিশ্বাস করে বন্ধুতের ডাকে সাড়া না-দেয়া কী ঠিক? তাতে ইমোশনালি ব্লাকমেইল হবার সম্ভাবনা বেশি। প্রতিটি মানুষের বন্ধুর প্রয়োজন। তাই বলে আবেগের বর্শীভূত হয়ে বা ক্ষণিকের মোহে অন্ধের মতো বন্ধু নির্বাচন ঠিক নয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, অনেকেই বন্ধুত্ব তৈরী হওয়ার পূর্বে এমন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন যা ঐ মুহূর্তে বিপরীত দিক থেকে মনে হয় স্বর্গীয় দেবতার মতো । কিন্তু কিছুদিন পর যখন স্বর্গীয় দেবতার কথাবার্তা ভাব ভঙ্গি, কাজকর্মের অমিল, তখনই ফাঁটল ধরে মধুর সম্পর্ক বা বন্ধুত্বে। যার ফলশ্রুতিতে এক সময়ের হৃদয় কাঁপানো মানুষটি হয়ে উঠে বেদনার উৎস এবং সময়ের সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের ও ঘটে অপমৃত্যু। বন্ধুত্ব এমন এক সম্পর্ক যেটা ধারণ বা বহন করার ক্ষমতা সবার মধ্যে থাকে না। আমার মতে, বন্ধুত্ব হওয়া চাই শাদা গ্লাসের মতো ঝকঝকে পরিষ্কার। আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা, পছন্দ, অপছন্দ ও মন-মানসিকতা বোঝার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত থাকে বন্ধুত্বের মূল শেকড়। আর সে জন্যই আমাদের উচিত বন্ধু নির্বাচনে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা এবং ‘উড়াল হাওয়া’কে বিশ্বাস না করে প্রকৃত মানুষের অপেক্ষায় বন্ধুত্বের দোয়ার খুলে রাখা।

শাহনাজ সুলতানা

সাহিত্য সম্পাদক

ইউকেবিডি টাইমস ও

সম্পাদক

নারী এশিয়ান ম্যাগাজিন
 
 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার