আজকে

  • ১১ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৫শে জুন, ২০১৮ ইং
  • ৯ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

বাংলা  সাহিত্যঃ সিলেট ও সিলেটি

Published: বৃহস্পতিবার, মার্চ ১, ২০১৮ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: বৃহস্পতিবার, মার্চ ১, ২০১৮ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
 
মোহাম্মদ এবাদুর রহমান শামীমঃ
বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্য নামে পরিচিত। বাংলা সাহিত্য বাঙালি জাতিসত্তার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের বহিঃপ্রকাশ। গবেষকদের মতে, খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়।  খ্রিস্টীয় সপ্তম/দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধদোঁহা/গানের সংকলন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নমুনা। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত কাব্যপ্রধান। বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ও  গ্রাম-বাংলার লৌকিক, পারলৌকিক এবং অলৌকিক বিশ্বাসগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল তখনকার বাংলা সাহিত্য। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলি, শাক্ত পদাবলি, বৈষ্ণব সন্তজীবনী, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ, লোক ও গীতিকা সাহিত্য, মরমী সাহিত্য ও বাউল পদাবলি এবং পুঁথি ও ইসলামি সাহিত্য ছিল বাংলা সাহিত্যের মূল উপজীব্য। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয় খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। বর্তমানে বাংলা সাহিত্য বিশ্ব সাহিত্যের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ  ধারা হিসেবে পরিগণিত। বাংলা সাহিত্যের সূচনা, ক্রমবিকাশ ও সমৃদ্ধির ধারায় সিলেট এবং সিলেটি কবি সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
পবিত্রভূমি নামে খ্যাত সিলেট বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের  ঐতিহাসিক একটি  প্রাচীন জনপদ। প্রাচীনকাল থেকে ৪৭’র দেশভাগ পর্যন্ত সিলেট বিভিন্ন সময় বিভিন্ন খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের আয়তন ও সীমানা বারংবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং অভিহিত হয়েছে বিভিন্ন নামে-উপনামে। প্রাচীন ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব  চার হাজার অব্দেও সিলেটে উন্নত সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙের ভাষায়, শ্রীহট্ট একটা প্রাচীন ও গৌরবশালী দেশ। নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর বিশ্বের বুকে এক বিস্ময় ভূমির নাম সিলেট। প্রাচীনকাল থেকে বহু ভাষাভাষী জাতি, গোত্র, বর্ণ ও ধর্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছে এই জনপদ। পৌরাণিক যুগে এই জনপদ প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঐযুগে সিলেটের লাউড় পর্বতে কামরূপ রাজ্যের উপরাজধানী ছিল বলে জানা যায়। মরক্কোর পর্যটক ও ঐতিহাসিক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক “কিতাবুল রেহেলা” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সফরকালে কামরূপের পার্বত্য অঞ্চলে বিখ্যাত সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিনের [হযরত শাহজালাল রহ.] দর্শন লাভ করেন। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী এই জনপদে বসতি স্থাপন করেছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর পর জয়ন্তীয়া, লাউড় ও গৌড় নামে তিনটি স্বতন্ত্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন গৌড় রাজ্যই বর্তমান বিভাগীয় শহর সিলেট বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। মৈথিলী পণ্ডিতদের মতানুসারে, শ্রীহট্ট হলো পূর্ব মিথিলা।
প্রাচীনকাল থেকেই সিলেট জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ধর্ম চর্চা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের তীর্থভূমি হিসেবে যুগে যুগে সুখ্যাতি পেয়েছে। বৌদ্ধ সহজিয়া, সাধু-সন্যাসী, বৈষ্ণব ও পীর-সাধক-সূফী-দরবেশ, পরিব্রাজক এবং বণিকদের নিরাপদ আবাসভূমি ছিল এই শান্তির জনপদ। আবহমান’কাল থেকে সিলেটের রূপ-প্রকৃতি এবং মানুষের উদারতা, আন্তরিকতা ও আত্মীয়তায় মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। পল্লীকবি জসীম উদ্-দীনের ভাষায়, সিলেট একটি কবিত্বময় পরিবেশের আদি নিবাস, এখানে বাস করে কবি না হয়ে পারা যায় না। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের ভাষায়, শ্রীহট্ট হলো দার্শনিকদের জন্মভূমি। কবিগুরু এবং আমাদের জাতীয় কবিও সিলেটের উদার, নৈসর্গিক ও কবিত্বময় পরিবেশে গুণকীর্তন করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উদার পরিবেশ বিদ্যমান থাকায় এই জনপদে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি এবং সেই সাথে সিলেটি কবি সাহিত্যিকগণও সাহিত্য চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতায়  উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। চর্যাপদ, বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, ইসলামি ও পুঁথি  সাহিত্য,  লোকসাহিত্য, বাউল সাহিত্য ও মরমী সাহিত্য রচনায় সিলেটি কবি সাহিত্যিকদের  অবদান সর্বজন স্বীকৃত।
প্রাচীন যুগ [৬৫০- ১২০০]
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র আদি নিদর্শন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ এবং ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ৯৫০ থেকে ১২০০ খিস্টাব্দের মধ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া কর্তৃক চর্যাপদের পদগুলো রচিত হয়। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রয়েল লাইব্রেরি থেকে চর্যার একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চর্যাপদের সঙ্গে বাংলা ভাষার অনস্বীকার্য যোগসূত্র যুক্তিসহ প্রতিষ্ঠিত করেন।  চর্যাপদের ভাষার সাথে সিলেটি ভাষার অনেকটা মিল রয়েছে বলে ভাষাতত্ত্ববিদগণ মনে করেন। ভাষা বিজ্ঞানী ড. আহমদ শরীফসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার সম্পর্কের সূত্রটি আজ অবধি অক্ষুন্ন আছে।  চর্যাপদে ব্যবহৃত হাকম [সেতু], উভাও [দাঁড়াও], মাত [কথা] প্রভৃতি সিলেট অঞ্চলের ভাষা হিসেবে পরিচিত। সৈয়দ মুজতবা আলী ও অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর মতে, চর্যাপদের পদ রচয়িতাদের মধ্যে লুইপা, দারিকপা, ঢেণ্ডণপা, মহীধরপা ও সরহপা প্রমুখ কামরূপ রাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন। চর্যাপদের ভাষাকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বঙ্গকামরূপী ভাষা বলে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলী  ‘সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় জালালাবাদ’ এবং ‘চর্যাপদে সিলেটী ভাষা’ গ্রন্থ দুইটির মাধ্যমে  প্রমাণ করেন যে, চর্যাপদের অনেক কবি সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ‘চর্যাপদে সিলেটী ভাষা’ গ্রন্থে চর্যাপদের ৪০৮টি শব্দ সংগ্রহ করে চলমান সিলেটি ভাষার সাথে মিলিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, চর্যাপদের ভাষার সাথে সিলেটি ভাষার মিল রয়েছে। চর্যাপদের অন, অনে, আলাজালা, আলে, উছারা, উরে, উমত, একারে, একেলে, এথা, এবে, কট, কপালী, কা, কাআ, কাউই এবং কান্ধ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার এখনো সিলেট অঞ্চলে রয়েছে। গোরক্ষনাথের গানে সিলেটি শব্দের যে সন্ধান পাওয়া যায়, তার নমুনা-
“পখরীতে পানি নাই পার কেন বুড়ে
বাসা ঘরে ডিম্ব নাই ছাও কেন উড়ে
নগরে মনুষ্য নাহি ঘরে ঘরে চাল
আন্ধলে দোকান দিয়া খরিদ করে কাল।”
উপর্যুক্ত চরণগুলোর মধ্যে পার, বুড়ে, ছাও, চাল প্রভৃতি বহুল ব্যবহৃত সিলেটি ভাষার শব্দ।
মধ্যযুগ [১২০১- ১৮০০]
বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য, নাথসাহিত্য, লোক ও গীতিকা সাহিত্য, মরমী সাহিত্য ও বাউল পদাবলি, পুঁথি ও ইসলামি সাহিত্য ইত্যাদি ছিল মধ্যযুগের প্রধান সাহিত্যধারা।
বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলিঃ
বৈষ্ণব সাহিত্য ও পদাবলিকে মধ্যযুগের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সাহিত্যধারা হিসেবে গণ্য করা হয়। পঞ্চদশ শতকে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যদেবের [১৪৩৩-১৫৩৩]  ভাব-দর্শন   ও বৈষ্ণব পদাবলির প্রধান অবলম্বন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার সম্মিলনে বৈষ্ণব সাহিত্যধারার সূচনা হয়। বাংলা সাহিত্যে একটি পঙতি না লিখলেও তাঁর নামে একটি যুগের [চৈতন্যযুগঃ ১৫০০-১৭০০] সৃস্টি হয়। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষরা ছিলেন পূর্ব বাংলার শ্রীহট্টের ঢাকা দক্ষিণ শহরের  আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপে অধ্যয়ন ও সংস্কৃত শাস্ত্রচর্চার জন্য  বসতি স্থাপন করেন। বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের সূচনা ঘটে চর্তুদশ শতকে,  তবে ষোড়শ শতকে এই সাহিত্যেধারা বিকশিত হয়। মানবতাবাদে উদ্বুদ্ধ  চৈতন্যদেবপার্ষদ-পরিকর,  ষড়গোস্বামী এবং অসংখ্য ভক্ত সহযোগে দেশব্যাপী একটি ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে তোলেন; যা ইতিহাসে  বৈষ্ণব আন্দোলন নামে পরিচিত। চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব সাহিত্য এই আন্দোলনেরই স্বর্ণফসল। এরই মধ্যদিয়ে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার দিগন্ত বিস্তৃত হয় এবং এক সময় এর সঙ্গে চৈতন্যদেবের লৌকিক-অলৌকিক  জীবনলীলাও যুক্ত হয়। সংস্কৃতে রচিত প্রথম জীবনীগ্রন্থ ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ এর রচয়িতা  চৈতন্যদেবের সতীর্থ শ্রীহট্ট সন্তান মুরারি গুপ্ত। গ্রন্থখানি গদ্য-পদ্যের মিশ্রণে কড়চা বা ডায়েরি আকারে রচিত। বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম জীবনীকাব্য  ‘চৈতন্যভাগবত’ [১৫৪৮] বৃন্দাবন দাস শ্রীচৈতন্যের ঘনিষ্ঠ সহচর নিত্যানন্দের উৎসাহে  প্রায় ২৫ হাজার জোড় চরণে  রচনা করেন। পরবর্তীতে লোচন দাস ‘চৈতন্য-মঙ্গল’ [১৫৭৬],  কৃষ্ণদাস কবিরাজ সর্বাপেক্ষা তথ্যবহুল ও শ্রেষ্ঠ  চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ  ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ [১৬১২] রচনা করেন। আঠারো শতকের গোড়া থেকে কিছু পদ-সংকলন পাওয়া যায়; যেমনঃ বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর ‘ক্ষণদাগীতচিন্তামণি’ [১৭০৫], রাধামোহন ঠাকুরের ‘পদামৃতসমুদ্র’, বৈষ্ণবদাসের ‘পদকল্পতরু’ [১৭৬০], নরহরি চক্রবর্তীর ‘গীতচন্দ্রোদয়’ ইত্যাদি। পদকল্পতরুতে ১৫০ জন কবির প্রায় ৩০০০ বৈষ্ণব পদ সংকলিত হয়েছে। মধ্যযুগে কৃষ্ণকথা, রাধাকৃষ্ণ প্রেম, চৈতন্যলীলা, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি অবলম্বনে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় রসসমৃদ্ধ পদাবলি, তথ্যসমৃদ্ধ চরিতকাব্য, তত্ত্ববহুল শাস্ত্রগ্রন্থ ইত্যাদি রচনার মূল প্রেরণা ছিলেন শ্রীচৈতন্যের অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব, জীবন ও ধর্মবোধ। চৈতন্যপরিকরদের মধ্যে সবচেয়ে বর্ষীয়ান ছিলেন শ্রীহট্ট সন্তান অদ্বৈত আচার্য বা অদ্বৈতাচার্য গোস্বামী [১৪৩৪-১৫৫৯]। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত একজন বৈষ্ণব দার্শনিক এবং ধর্মবেত্তা। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনিই প্রথমবারের মত নিমাইকে [শ্রীচৈতন্যদেবের বাল্যকালীন ডাকনাম] স্বয়ং ভগবান মানেন। পুরীতে এক রথযাত্রার অনুষ্ঠানে তিনি চৈতন্যদেবকে একজন অবতার হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁকে নিয়ে সংস্কৃতে একখানা এবং বাংলায় চারখানা কাব্য রচিত হয়েছে। ‘বাল্যলীলাসূত্র’ [১৪৮৭] নামে সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেন হরকৃষ্ণ দাস। এতে অদ্বৈত আচার্যের বাল্যলীলার বিবরণ রয়েছে। বাংলা ভাষায় ‘অদ্বৈতপ্রকাশ’ [১৫৬৯] নামে প্রথম কাব্য রচনা করেন ঈশান নাগর। এরূপ দ্বিতীয় কাব্য হরিচরণ দাসের ‘অদ্বৈতমঙ্গল’। একই নামে শ্যামদাস তৃতীয় কাব্য রচনা করেন, তবে পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। নরহরি দাস ‘অদ্বৈতবিলাস’ নামে চতুর্থ কাব্য রচনা করেন আঠারো শতকে। এইসব কাব্যে অদ্বৈত আচার্যের সঙ্গে চৈতন্যদেবেরও অনেক প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। অদ্বৈত আচার্যের পত্নী সীতাদেবীর জীবনী ‘সীতাচরিত’  ও ‘সীতাগুণকদম্ব’ যথাক্রমে লোকনাথ দাস ও বিষ্ণুদাস আচার্য রচনা করেন। তাঁর বংশধর বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী  ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম আচার্য। উনিশ শতকের শেষ দিকে ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ [১৮৯৫] গ্রন্থে ১৬৪ জন পদকর্তার নাম এবং ৪৫৪৮ পদসংখ্যার উল্লেখ করেন। বর্তমানে বৈষ্ণবপদের সংখ্যা ৭০০০- ৮০০০, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মধ্যযুগের এই পদাবলি সাহিত্য অনুসৃত হয় নবধারার কাব্যযুগে এবং বাংলা সাহিত্যে ভোরের পাখি খ্যাত বিহারীলাল চক্রবর্তীর  হাত দিয়ে তা গীতি কবিতায়  উৎকর্ষ লাভ করে। এই ধারায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্য রচনা করে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। আধুনিক কাব্যযুগেও গীতি কবিতার স্বকীয়তা ও জনপ্রিয়তা হারিয়ে যায়নি।
অনুবাদ সাহিত্যঃ
পৃথিবীতে যে চারটি মৌলিক মহাকাব্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তন্মধ্যে ‘মহাভারত’ অন্যতম। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস রচিত সংস্কৃত মহাকাব্যটি পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। মহাভারতে প্রথম অনুবাদক কে, এনিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতানৈক্য বয়েছে। তবে অনেক গবেষক মহাভারতের আদি অনুবাদক হিসেবে মহাকবি সঞ্জয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি [শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে] ও প্রদীপ ভট্টাচার্য মহাভারতের প্রথম অনুবাদক মহাকবি সঞ্জয় লাউড় [বর্তমান সুনামগঞ্জ, সিলেট]] অঞ্চলের লোক ছিলেন বলে মত দেন। মহাকবি সঞ্জয় সম্পর্কে সর্বপ্রথম ড. দীনেশ চন্দ্র সেন মত প্রকাশ করেন যে, কবীন্দ্র পরমেশ্বর নহেন, সঞ্জয়ই মহাভারতের আদি অনুবাদক। এই প্রসঙ্গে শ্রী অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ [প্রথম খন্ড] গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে, কবীন্দ্র পরমেশ্বর সঞ্জয়ের রচনায় রঙ ফলিয়ে নিজে খ্যাতি লাভ করেন।  মহাকবি সঞ্জয় ও তাঁর মহাভারত নিয়ে ড. কাজী দীন মুহম্মদ বলেন, সঞ্জয়ই প্রথম সংস্কৃত থেকে মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করেন। ড. মুনীন্দ্রকুমার ঘোষ সম্পাদিত ‘কবি সঞ্জয় বিরচিত মহাভারত’ [কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  প্রকাশিত]  গ্রন্থের ভূমিকায় শ্রী বিজন বিহারী ভট্টাচার্য  লিখেছেন, সঞ্জয় নামে বাংলা মহাভারত রচয়িতা একজন প্রাচীন কবি ছিলেন। ড. মোহাম্মদ সাদিকের মতে, বাংলায় মহাভারতের আদি অনুবাদক সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার [প্রাচীন লাউড় রাজ্য] সন্তান মহাকবি সঞ্জয়ের মাধ্যমে এতদঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস আলোকিত হয়ে আছে।
মঙ্গলকাব্যঃ
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্য মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। মনসামঙ্গল বা পদ্মাপু্রাণ ও চণ্ডীমঙ্গল বা অভয়ামঙ্গল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য। মঙ্গলকাব্যের অন্যতম কবি মানিক দত্ত ও নারায়ণ দেব গৌড়ীয় অঞ্চলের লোক ছিলেন। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আদি কবি মানিক দত্ত। নারায়ণ দেব মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যের একজন জনপ্রিয় ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। শ্রীহট্টের বিরজাকান্ত ঘোষ ১৩১৯ সনে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় নারায়ণ দেবকে শ্রীহট্টের  অধিবাসী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। ১৩২০ সনে সৌরভ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় রমানাথ চক্রবর্তী সতীশচন্দ্রকে সমর্থন করেন। আবার, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক গ্রন্থে নারায়ণ দেবকে আসামের লোক বলে দাবি করেন। ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর লিখিত একখানা প্রাচীন পুঁথির আলোকচিত্র কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথি বিভাগে রক্ষিত রয়েছে। এই দুই কবি ছাড়াও সিলেটের ষষ্ঠীবর দত্ত, আনন্দরাম চক্রবর্তী [পদ্মপূরাণ, অন্নদাপরিচয় ও তুলসী মঙ্গল উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ], কবি বল্লভ, কালা রায়, বর্ধমান দত্ত, গোপীনাথ দ্বিজ, মুরারী মিশ্র, হরিহর দত্ত, রাধামাধব দত্ত ও রাধানাথ রায় চৌধুরী প্রমুখ মঙ্গল কবির নাম উল্লেখযোগ্য। ‘বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, রাধানাথ রায় চৌধুরী মনসামঙ্গল কাব্যের সর্বশেষ কবি ছিলেন।
লোকসাহিত্যঃ
লোকসাহিত্য বলতে লোকমুখে চর্চিত গাঁথা-কাহিনী, গান, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদিকে বুঝানো হয়; যা অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। লোকসাহিত্যকে প্রধানত লোকসঙ্গীত,  গীতিকা,  লোককাহিনী, লোকনাট্য, ছড়া,  মন্ত্র,  ধাঁধা ও   প্রবাদ  এই আটটি শাখায় ভাগ করা যায়। সিলেট অঞ্চলকে বাংলা লোকসাহিত্যের খনি বা ভাণ্ডার বলা হয়। সিলেটের লোকমুখে আবহমানকাল থেকে প্রচলিত ধামাইল গান [রাধারমণ দত্ত রচিত], বিয়ার গান, ঘাটুগান, মালসি গান, ধুরাগান, ভট্ট কবিতা , ত্রিনাথের গান, গোবিন্দ ভোগের গান, ভানু গীত [শেখ ভানু রচিত], ডরাই পূজার গান, আরিগান, মালজোড়া/কবি গান [মালজোড়া গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়ক সূফি সাধক ক্বারী আমির উদ্দিন আহমেদ], হাজিরাত গান, বারোমাসি গান, মারফতি গান, মুরশিদি গান ও পাঁচালি গান প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলী তাঁর ‘মৈমনসিংহ গীতিকা বনাম সিলেট গীতিকা’ গ্রন্থের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র দশটি গীতিকার মধ্যে সাতটি গীতিকা সিলেট অঞ্চলের। লোকসাহিত্য গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী এই মত সমর্থন করেন। চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ সংগৃহীত  ১০টি গীতিকা নিয়ে ‘সিলেট গীতিকা’ নামে একখানা গ্রন্থ ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর সম্পাদনায় ১২০টি লোকগাথা নিয়ে ‘সিলেট গীতিকা’ গ্রন্থখানা ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। ‘সিলেটী প্রবাদ প্রবচন’ তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। গুরুসদয় দত্ত আই.সি.এস সংগৃহীত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘শ্রীহট্টের লোক সংগীত’, শশীমোহন চক্রবর্তী সংগৃহীত ‘শ্রীহট্টীয় প্রবাদ প্রবচন’ ও অধ্যাপক পদ্মনাথ ভট্টাচার্যের ‘শ্রীহট্ট ভট্টসঙ্গীত’ লোকসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সিলেট অঞ্চলে লোকসাহিত্যের ভাণ্ডার যে অফুরন্ত তা স্বীকার করেছেন লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী ও ড. শামসুজ্জামান খানসহ অনেকেই। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে, সিলেট লোকসংস্কৃতির চারণভূমি এবং লোকসংস্কৃতির অফুরন্ত ভান্ডার; যা বুকে ধারণ করে এই ভূখণ্ড এবং মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে উজ্জ্বলতর অবদান রেখে চলছে যুগ যুগ ধরে।
মরমী সাহিত্য ও বাউল পদাবলিঃ
হযরত শাহজালাল [রহ.]’র স্মৃতি বিজরিত ৩৬০ আউলিয়ার পদধূলিতে ধন্য দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ পূণ্যভূমি সিলেটকে বলা হয় বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী। সিলেটকে মরমীবাদ, লোকগীতি ও লোকসংস্কৃতি এবং আউল-বাউলের চারণভূমি বলেও আখ্যায়িত করা হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন লোকঐতিহ্যের অনবদ্য ফসল মরমী/মার্সিয়া সঙ্গীত বা মরমীবাদের গান। মারেফতি বা ফকিরালী গানের পোশাকী নাম মরমী সাহিত্য। প্রাচীন লোকসাহিত্য বা লোকঐতিহ্যের একাংশের রূপান্তর মরমী সাহিত্য। আবার, বাউল সম্প্রদায়ের গানও বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ। উল্লেখ্য যে, মরমী সঙ্গীত ও বাউল গানকে অধুনা যুগে যদিও এক করে ভাবা হয়, কিন্তু এর ইতিহাস সন্ধানী সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অন্যান্যদের কাছে এর ভাবধারায় ভিন্নতা রয়েছে বলে অভিমত পাওয়া যায়। যুগ যুগান্তর ধরে বৌদ্ধ সহজিয়া, সন্ন্যাসী, সূফী, ফকির, পীর, দরবেশ ও আউলিয়ার ক্রমধারায় সিলেট অঞ্চলে জন্ম হয়েছে বহুসংখ্যক কবি, ভাবুক ও সাধকের। মরমী, লোক ও  বাউল গানের উল্লেখযোগ্য কবি, সুর স্রস্টা ও সাধকদের মধ্যে  ইবরাহীম তশনা, শাহ্ আছদ আলী, ভেলা শাহ, পাঞ্জ শাহ, পাগলা কানাই, রাধারমণ দত্ত, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, জালাল খাঁ, কালা শাহ, দুর্বিন শাহ, দীন ভবানন্দ, দেওয়ান হাছন রাজা,  শেখ ভানু, সহিফা বানু, সৈয়দা মমতাজ বেগম, সৈয়দা ছামিনা বানু, গোবিন্দ গোস্বামী, মেহেরজান, ফকির আজমত আলী, জবান আলী, আয়াত শাহ, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, দেওয়ান একলিমুর রাজা, পণ্ডিত রামকানাই দাশ, সুষমা দাস, শেখ ওয়াহিদুর রহমান, কফিল উদ্দিন সরকার, শাহ ইসকন্দর মিয়া, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, চাঁন মিয়া, শাহ রমিজ আলী, আহমদ খায়রুল আলম চৌধুরী [একে আনাম], কাকন ফকির, জামাল উদ্দিন হাসান বান্না, কালা মিয়া, আকরামুল ইসলাম, হেলাল উদ্দিন ও বাউলকুল শিরোমণি ক্বারী আমির উদ্দিন আহমেদ প্রমুখের নাম প্রণিধানযোগ্য। এছাড়া বাউল, মরমী ও লোক গানের পাশাপাশি আধুনিক বাংলা গানের ভুবনেও সেলিম চৌধুরী, মামুন, সঞ্জীব চৌধুরী ও সুবীর নন্দী প্রমুখ দেশেবিদেশে সুখ্যাতি লাভ করেছেন।
সিলেটি নাগরী লিপি ও সাহিত্যঃ
সিলেটি নাগরী লিপি ও সাহিত্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্যিক সম্পদ। যা সিলেটিদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ এবং গর্বের ধন। পৃথিবীর অনেক ভাষার যেখানে নিজস্ব  লিপি বা বর্ণমালা নেই, সেখানে বাংলা ভাষার রয়েছে দুইটি লিপি বা বর্ণমালা। একটি বঙ্গ লিপি, অন্যটি সিলেটি নাগরী লিপি। সিলেটি নাগরী লিপি বাংলা লিপির একটি বিকল্প লিপি। আঞ্চলিক ভাষার ন্যায় সাহিত্য-সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে সিলেটিদের এককভাবে গর্ব করার বিষয় হলো তাঁদের নিজস্ব লিপিমালা। সিলেটের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম দলিল নাগরী লিপি। এই নাগরী লিপিতেই রচিত হয় তৎকালীন উন্নত সাহিত্য। সিলেট ছাড়াও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং বর্তমান ভারতের আসাম, করিমগঞ্জ, শিলচর, বদরপুর, হাইলাকান্দি, ত্রিপুরা নাগরী লিপির প্রচলন ছিল। নাগরী লিপির গবেষক অধ্যাপক ড. আশ্রাফুল করিম নাগরী লিপিকে বিজ্ঞানসম্মত বলে অভিমত দিয়েছেন। গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর মতে, সিলেটি নাগরী লিপির উদ্ভাবন হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগরী লিপির প্রচলনকাল বলে মত প্রকাশ করেন। সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্য সিলেটি নাগরী বা নাগরী  পুঁথি সাহিত্য  নামে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে। নাগরী লিপিতে রচিত সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু প্রধানত নামায, রোজা, হজ, যাকাত, ইসলামের অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং রাগ, মানবিক প্রণয়োপাখ্যান, বাউল ও মরমী সঙ্গীত। যা বাংলা লোক সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।  নাগরী পুঁথি  সাহিত্যে মুন্সী  মোহাম্মদ ছাদেক আলী [পূর্বনাম গৌর কিশোর সেন] সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তিনি ১৭৯৮ সালে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার লংলা পরগণায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর রচিত বিশ্বনবীর জীবনী গ্রন্থ ‘হালতুননবী’ [১৮৫৫] সিলেটি নাগরী তথা পুঁথি সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত গ্রন্থ। সিলেটি নাগরীতে লিখিত সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ হচ্ছে সাধক কবি গোলাম হুছনের ‘তালিব হুছন’ [১৫৪৯]। পরে নাসির মোহাম্মদ ‘রাগনামা’ [১৭২৭], সৈয়দ শাহনূর “নূর নছিহত [১৮১৯], রাগনূর, সাতকন্যার বাখান”, শাহ হুছন আলম ‘ভেদসার’, শীতালং শাহ “মুশকিল তরান, হাসর তরান, রাগবাউল, কেয়ামতনামা, শীতালাঙ্গী রাগ”, নছিম আলী হরুফুল ‘খাছলাত’ [১৮৭৫], মুন্সী মোহাম্মদ সাদেক আলী “হালতুননবী [১৮৫৫], মহব্বতনামা, হাসর মিছিল, রদ্দেকুফুর” এবং ওয়াহেদ আলী “জঙ্গ নামা” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থমালা রচনা করেন। এছাড়া নাগরী পুঁথি রচয়িতাদের মধ্যে এই পর্যন্ত মুন্সী ইরপান আলী, দৈখুরা মুন্সী, আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী, আব্দুল লতিফ, আমান উল্যা, ওয়াজি উল্যা, শাহ হরমুজ আলী, শাহ আরমান আলী, হাজী ইয়াছিনসহ অনেকের লেখা গ্রন্থ পাওয়া যায়। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার দীন ভবানন্দ বাংলায় কৃষ্ণলীলা বিষয়ক ‘হরিবংশ’ [১১৫৬ বঙ্গাব্দ] নামে একখানা পুঁথিগ্রন্থ রচনা করেন। হরিবংশ পুঁথি তৎসময়ে অত্যধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ আফজাল নামে এক ব্যক্তি ‘হরিবংশ’ গ্রন্থখানা সিলেটি নাগরী লিপিতে ‘মজমা রাগ হরিবংশ’ নামে দুইখণ্ডে প্রকাশ করেন।  সিলেটি নাগরী লিপিতে মোট কতখানা গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ তাঁর ‘সিলেটী নাগরী পরিক্রমা’ গ্রন্থে ১১২ খানা গ্রন্থের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর মতে, নাগরী লিপিতে লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫০ খানা। সিলেটি নাগরী লিপি নিয়ে গবেষণা করে ইতোমধ্যে অনেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. গোলাম কাদির, আসাম রাজ্যের গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. আব্দুল মুছাব্বির ভূঁইয়া, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. মোহম্মদ সাদিক এবং লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃটিশ নাগরিক জেমস লয়েড উইলিয়াম, সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী ও রূপা চক্রবর্তী পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে এই লিপি নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ইসলামি সাহিত্যঃ
মুসলমানরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসে সুলতানি আমলে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের সবচেয়ে বড় অবদান কাহিনী কাব্য বা রোম্যান্টিক কাব্যধারার প্রবর্তন। সিলেটি নাগরী পুঁথি সাহিত্যকে অনেকে মুসলমানি বা ইসলামি সাহিত্য বলেও অভিহিত করে থাকেন। সিলেটের প্রাচীন সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে ‘মদনুল ফওয়ায়েদ’ নামের একখানা ইসলামি গ্রন্থ। ফারসি ভাষায় লিখিত গ্রন্থের লেখক হলেন  তরফ বিজেতা নাসির উদ্দীনের প্রপৌত্র দিল্লির সুলতানি দরবার হতে ‘মালেক-উল-উলামা’ উপাধি প্রাপ্ত শাহ সৈয়দ ইসরাইল। শ্রীহট্টের পৈলের সৈয়দ বংশের শাহ সৈয়দ রেহান উদ্দীন ফারসি ভাষায় কবিতা লিখে দিল্লি হতে ‘বুলবুলে বাংলা’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি উর্দু ভাষায় ‘মসনবীয়ে বাকাউলী’ ও ‘খাবনামা’ গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন খ্যাতি অর্জন করেন। হযরত শাহজালাল [র.] এর প্রধান সেনাপতি শ্রীহট্ট বিজয়ী সৈয়দ নাসিরুদ্দীন সিপাহসালার [১৩০০-১৪০০] অধস্তন পুরুষ মহাকবি সৈয়দ সুলতান [১৫৫০-১৬৪৮] ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর জন্ম সিলেটের হবিগঞ্চে [উইকিপিডিয়া ও হবিগঞ্জ জেলা তথ্য বাতায়ন]। মার্সিয়া সাহিত্য গ্রন্থ ‘মক্তুল হুসেন’ কাব্যের রচয়িতা মুহম্মদ খান ছিলেন তাঁর শিষ্য। কবির সর্ববৃহৎ ও শ্রেষ্ঠ রচনা ‘নবীবংশ’ কাব্যগ্রন্থ। “রসুলচরিত, জ্ঞানপ্রদীপ, জ্ঞানচৌতিশা,  জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলিস নামা, শব-ই মেরাজ, মারফতী গান ও পদাবলী”  তাঁর  উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। শেখ চান্দ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম একজন কবি। তিনি “তালিবনামা, হরগৌরী সম্বাদ ও  রসুলবিজয়”  তিনটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। প্রথম দুইটি যোগ ও সুফিতত্ত্ব সংক্রান্ত এবং ‘রসুলবিজয়’ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর জীবনকেন্দ্রিক বিশাল একখানা কাব্যগ্রন্থ। মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতান ও শেখ চান্দকে চট্রগ্রামের অধিবাসী হিসেবে দাবি করে ড. আহমদ শরীফ তাঁর পি এইচ ডি থিসিস তৈরি করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী তাঁর ‘মহাকবি সৈয়দ সুলতান’ ও ‘সিলেটের মহাকবি শেখ চান্দ’ গ্রন্থদ্বয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে,  মহাকবি সৈয়দ সুলতান  ও শেখ চান্দ সিলেটের সন্তান ছিলেন।
সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ [১৯০৬-১৯৯৯] ইসলামি দর্শন ও সাহিত্য অঙ্গনে দেশের প্রবাদ পুরুষদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন  শিক্ষাবিদ, ইসলামি চিন্তাবিদ ও দার্শনিক, লেখক, সমালোচক ও জাতীয় অধ্যাপক। সাহিত্য, দর্শন, সমাজ, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে মোহাম্মদ আজরফের প্রায় ৬০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রায় ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ অপ্রকাশিত রয়েছে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “তমদ্দুনের বিকাশ, ইসলাম ও মানবতাবাদ, মরমী কবি হাসন রাজা, ধর্ম ও দর্শন”  ইত্যাদি। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ অবদানের জন্য মোহাম্মদ আজরফ স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, আন্তর্জাতিক মুসলিম সংহতি পুরস্কার, একুশে পদক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, বাংলাদেশ মুসলিম মিশন পুরস্কারসহ অসংখ্য  পুরস্কারে ভূষিত হন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসামান্য অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৩ সালের ৪ নভেম্বর তাঁকে সম্মানসূচক জাতীয় অধ্যাপক পদ প্রদান করে।
সুনামগঞ্জের আরেক কৃতিসন্তান অধ্যাপক শাহেদ আলী [১৯২৫-২০০১] বাংলাদেশের খ্যাতিমান ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক। তাঁর চিন্তা, কর্ম ও লেখনশৈলীর মূল বিষয় ইসলামি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বিপ্লব। তিনি একাধারে একজন ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, সম্পাদক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিসেবী, অনুবাদক ও লেখক হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক শাহেদ আলী ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জ থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সচিব নিযুক্ত হন এবং পরে অনুবাদ ও সংকলন বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি মাসিক প্রভাতি, সাপ্তাহিক সৈনিক, দৈনিক বুনিয়াদ, মাসিক সবুজ পাতা, আল্লামা ইকবাল সংসদ গবেষণা পত্রিকা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন গবেষণা পত্রিকার সম্পাদক এবং বাংলা একাডেমী পত্রিকা ও ইসলামি বিশ্বকোষের সম্পাদনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। শাহেদ আলী গল্পগ্রন্থ, নাটক, উপন্যাস, অনুবাদ গ্রন্থ, গবেষণা গ্রন্থ, ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং শিশুসাহিত্যের উপর ৫০টিও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘জিব্রাইলের ডানা’ [১৯৫৩] গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধ্যাপক শাহেদ আলী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কয়েকটি সম্মাননা, পুরস্কার ও পদক লাভ করেন। এরমধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার [১৯৬৪], তঘমা-ই-ইমতিয়াজ [১৯৬৯], ভাষা আন্দোলন পদক [১৯৮১], ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার [১৯৮৬], একুশে পদক [১৯৮৯] ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পুরস্কার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া ইসলামি সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা, প্রসার ও বিকাশে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সাহিত্য সংগঠন সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ [কেমুসাস] ও এর মুখপত্র মাসিক আল-ইসলাহ্ তাৎপর্যপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে।
আধুনিক যুগ [১৮০১- বর্তমান]
উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য ও সায়েন্স ফিকশন/কল্পবিজ্ঞান আধুনিক যুগের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। স্বাধীনতা উত্তর বাংলা সাহিত্যে  সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আজাদ, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিন ও রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের হাত ধরে আধুনিকতার নামে যৌন সুড়সুড়িতে ভরপুর অশ্লীল এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতার নামে ধর্ম বিদ্বেষপ্রসূত রচনাশৈলীর আমদানি হলেও পবিত্রভূমির কবি সাহিত্যকরা এক্ষেত্রে ছিলেন ব্যতিক্রম। ফলে সিলেটি কবি সাহিত্যিকগণ বরাবরই আলোচনা-সমালোচনার বাইরে থেকে নিরবে-নিভৃতে মূলধারার সাহিত্য সাধনায় নিজেদের নিবৃত্ত রেখে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। মুনসী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন, মোহনী মোহন দাস, বিপিনচন্দ্র পাল, ড. গোবিন্দ চন্দ দেব [জিসি দেব], অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ, মুহাম্মদ আসাদ্দর আলী, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, কবি দিলওয়ার, গৌরী শংকর ভট্টাচার্য্য তর্কবাগীশ, কাজী মুহম্মদ আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ মর্তুজা আলী, অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, ভীষ্মদেব চৌধুরী, ঝর্না দাশ পুরকায়স্থ, ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী, আফজাল চৌধুরী, ড. গোলাম কাদির, মুহাম্মদ নুরুল হক, এ জেড আব্দুল্লাহ, দিজেন্দ্র  শর্মা, ড. অরূপরতন চৌধুরী, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, আব্দুর রউফ চৌধুরী, ধ্রুব এষ, সালেহ চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ সাদিক, মোফাজ্জল করিম, শাকুর মাজিদ, রব্বানি চৌধুরী, আহমদ ময়েজ, ড. মুমিনুল হক, মোস্তফা সেলিম, আব্দুল মুকিত অপি, নৃপেন্দ্রলাল দাশ, হাসনাইন সাজ্জাদী এবং মুসা আল হাফিজ প্রমুখ সিলেটি কবি-সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকের চিন্তা-চেতনা এবং সৃস্টিকর্ম বাংলা শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ক্রমধারা ও বিকাশকে আরো বেগবান এবং সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সিলেটি কবি সাহিত্যিদের বিলেত গমন ও সাহিত্য চর্চা ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ার পরও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সিলেটি কবি সাহিত্যিকদের অবদান কোন অংশেই কম নয়। শেকড় সন্ধানী ও দেশপ্রেমিক সিলেটি কবি সাহিত্যিকগণ সুদূর প্রবাস জীবনেও বুদ্ধিবৃত্তিক শুদ্ধ সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। বাংলা সাহিত্য বিশেষত বাউল, মরমী ও লোক সাহিত্য এবং বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন শাহজালাল-হাছন-রাধারমন-দিলওয়ারের উত্তরসূরিরা।
১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ [কেমুসাস] উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সাহিত্য সংগঠন হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলা সাহিত্য চর্চায় কেমুসাস এবং এর মুখপত্র মাসিক আল- ইসলাহ্ লেখক, পাঠক ও গবেষক সৃস্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেট গণভোট [১৯৪৭], ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিসংগ্রামসহ দেশের সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শুদ্ধাচার আন্দোলনে জনমত সৃস্টিতে কেমুসাস ও আল-ইসলাহ্ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। অধুনা সময়ে রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশন মূলধারার শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির লালন, বিকাশ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশন থেকে প্রতি বছর শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় কৃতিত্বপূর্ণ কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার ও রাগীব-রাবেয়া একুশে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সিলেটি ভাষা [ছিলটী মাত]
পৃথিবীতে ৮ হাজার ভাষার মধ্যে ৩ হাজার ভাষার নিজস্ব লিপি বা বর্ণমালা আছে; তন্মধ্যে সিলেটি ভাষা অন্যতম। সিলেটি ভাষা  বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেটে প্রচলিত একটি  বৈচিত্র্যময় ও স্বতন্ত্র ভাষা। সিলেটি  ভাষা বাংলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং প্রাচীন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা । সিলেটি ভাষা পৃথিবীর একমাত্র আঞ্চলিক ভাষা, যে ভাষার নিজস্ব সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাকরণ ও লিপি  এবং নিজস্ব লিপিতে রচিত সমৃদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডার রয়েছে। সিলেটের এই বৈচিত্রময়  ভাষা বিশ্বব্যাপী সিলেটি ভাষা বা ছিলটী মাত নামে সুপরিচিত। সিলেটি ভাষা শুধু ভারত বা বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সময়ের বিবর্তনে সিলেটি প্রবাসীদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে। বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী থেকে জানা যায়, চতুর্দশ শতাব্দীতে আরাকান রাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ছিল সিলেটি ভাষা। উইকিপিডিয়ার সূত্রমতে, বৃহত্তর সিলেটের বর্তমান জনসংখ্যা এক কোটি। Sylheti Translation And Research [STAR] এর  উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সিলেটসহ সমগ্র বিশ্বে বর্তমানে এক কোটি ষাট লক্ষ মানুষের মুখের ভাষা হচ্ছে সিলেটি ভাষা। এমনকি ব্রিটেনের  স্কুলগুলোতে  স্বকীয় ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে সিলেটি ভাষা। এটা সিলেটিদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও সম্মানের বিষয়। বৈচিত্র্যময়, স্বতন্ত্র ও বিজ্ঞানসম্মত  নিজস্ব  লিপি বা বর্ণমালা এবং নিজস্ব ভাষা ও  সমৃদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডারের গর্বিত উত্তরাধিকারী সিলেটের অধিবাসীরা। যা পৃথিবীর অনেক বড় বড় জাতি-গোষ্ঠীর নেই।
সিলেট অঞ্চলের কবি সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি, সংস্কৃত, সিলেটি নাগরী, আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরবীন্দ্র কুমার সিদ্ধার্থ শাস্ত্রী তাঁর ‘শ্রীভূমির সন্তানদের সংস্কৃত সাধনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে ১০১ জন সিলেটি কবি সাহিত্যিকের ৩৫৯ খানা সংস্কৃত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন।  সৈয়দ মোস্তফা কামালের মতে, সিলেট বিভাগের অধিবাসীরা সাহিত্য চর্চায় বাংলাদেশের পথিকৃৎ। সিলেটের কবি সাহিত্যিকদের বাংলা ভাষা ও সিলেটি নাগরী ভাষাসহ মোট সাতটি ভাষায় সাহিত্য চর্চার ঐতিহ্য রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ইতিহাস প্রণেতা ও গবেষকদের অধিকাংশই সিলেট ও সিলেটের কবি সাহিত্যিকদের অবদান এড়িয়ে গেছেন। এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তির আশ্রয়ও নিয়েছেন। তবুও বাংলা সাহিত্যে সিলেট ও সিলেটিদের অবদান দাবিয়ে রাখতে পারেননি। বাংলা সাহিত্য চর্চায় সিলেট ও সিলেটি কবি সাহিত্যিকদের অনন্য অবদানের জন্য সিলেটকে বাংলা সাহিত্যচর্চার সূতিকাগার বা পিতৃভূমি বললে অত্যুক্তি হবে না।
মো. এবাদুর রহমান শামীম
শিক্ষক, কলামিস্ট ও কর আইনজীবী
সহায়ক তথ্যসূত্রঃ
১. বাংলাপিডিয়া
২. উইকিপিডিয়া
৩. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন [সিলেট বিভাগ এবং সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা]
৪. সিলেট বিভাগের ইতিবৃত্ত [ড. মুমিনুল হক]
৫. সিলেটী নাগরী লিপি ও বাংলা সাহিত্য [মুহম্মদ আসাদ্দর আলী]
৬. নাগরী লিপিঃ বাংলা ভাষার অনন্য সম্পদ এবং সিলেটি নাগরী লিপিঃ বিলুপ্ত এক ঐতিহ্যিক সম্পদ [মোস্তফা সেলিম]
৭. ড. গোলাম কাদিরঃ ছিলটী আত্মার আজীবন [সৈয়দ মোস্তফা কামাল]
৮. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা [ড. সৌমিত্র শেখর]
৯. লাউড় রাজ্য, মহাকবি সঞ্জয় ও তাঁর মহাভারতঃ মহাজনদের মতামত [ড. মোহাম্মদ সাদিক]
১০. sylhet-nagri.comsylheti.org.uk &  sylheti.net
১১. সিলেটঃ ইতিহাস ও ঐতিহ্য [ফরীদ আহমদ রেজা]
১২. বাংলা সাহিত্যের জন্ম ও দিক পরিবর্তনে সিলেটের কবি সাহিত্যিক ও সুলতানগণ [হাসনাইন সাজ্জাদী]
 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার