আজকে

  • ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
  • ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং
  • ২রা জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

জেলখানা থেকে আমার নেত্রী,আমার মায়ের চিঠিঃআশিক ইসলাম

Published: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮ ১:১৬ অপরাহ্ণ    |     Modified: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮ ১:১৯ পূর্বাহ্ণ
 

১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
রোজ শনিবার
সময়ঃ রাত ১১টা ৪০ মিনিট
স্থান : বকশীবাজার, পরিত্যাক্ত কেন্দ্রীয় কারাগর
ঢাকা, বাংলাদেশ।

আমার প্রিয় সন্তানেরা
অনেক আদর ও ভালোবাসা রইল। আশাকরি মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতের ছায়া তলে সকলে আছো। আমিও আছি তোমাদের দোয়ায়।
অনেক অনুরোধ করে দু দিন পর আজ কাগজ কলম পেয়েছি। তাই তোমাদেরকে লিখতে পারছি।
চারিদিকে শুন শান। একটি মাঝারি আকারের রুমে আমাকে রাখা হয়েছে। দিন বা রাতের তেমন কোন পার্থক্য বোঝা যায় না। রুমের ৩টি জানালা আছে যা বাইরে থেকে বিশেষ ভাবে আটকানো। খোলা যায় না, কিছুই দেখা যায় না।রাত বা দিনের পার্থক্য বুঝতে হয় খুব কষ্ট করে।
স্যতসেতে মেঝে, গুমট দুর্গন্ধ। কত দিন কত কাল এ ঘরে মনে হয় কেউ ঢোকেনি। কাঠের একটি চৌকি তার ওপর একটি চাদর, তিনটি কম্বল। একটি চেয়ার, একটি টেবিল আছে। মাথার ওপর তীব্র আলোর একটি লাইট, যা জ্বলে থাকে ২৪ ঘণ্টা। অনুরোধ করেও রাতের বেলায় কিংবা ঘোমানোর সময় এটি বন্ধ করাতে পারিনি। তাই গত ২ দিন এক প্রকার না ঘুমিয়ে আছি। তন্দ্রায় যখনই চোখ বুজে এসেছে দেখেছি তোমাদের মুখ। চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাই তোমাদের। দেখতে পাই উত্তাল সমুদ্রের মত তোমারা ছুটে আসছো তোমাদের মায়ের কাছে। শুনতে পাই মায়ের জন্য তোমাদের আকুলতা ব্যকুলতা আর পাথর চাপা কান্না। বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে তোমাদের জন্য।
আমার আদরের সন্তানেরা
এই নির্জনতায় আজ দু দিন ধরে চিন্তা করেছি আমার অতীত আর তোমাদের ভবিষ্যতের কথা। সময়ের হিসেব না রেখেই নামাজ পড়ছি, মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে কাঁদছি, তোমাদের জন্য, দুখী বাংলাদেশের জন্য। যদিও ওজু করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পানি বেশ ঠাণ্ডা। গরম পানির কোন ব্যাবস্থা নেই। চাইলেও পাওয়া যায় না। বাথরুমের বেসিনটা সম্ভাবত খুলে নিয়ে গেছে, অথবা আগে থেকেই হয়ত ছিলো না। ৩টি পত্রিকা পেয়েছি কিন্তু পত্রিকার ভেতরের পৃষ্ঠা গুলি রেখে দিয়েছে। একটি টিভি আছে যা দিয়ে শুধুমাত্র বিটিভি দেখা যায়। টিভি ছাড়লেও বিশ্রী শব্দ হতে থাকে। বাইরে কিছু প্রহরী আছে, ডাকলে সহজে কেও আসে না। দু বার ইউনিফর্ম পরা কিন্তু মুখ ঢাকা দুই তরুনী এসেছিলো। কথা বললে ওরা কোন উত্তর দেয় না। হয়তো ওদের ওপর এমনই নির্দেশ আছে। মনে হয়েছে ওদের লজ্জিত ছল ছল চোখ কিছু বলতে চায় কিন্তু পারে না। আসলে আমার ওপর চরম মানসিক নির্যাতন করার জন্যই বিনা ভোটের সরকার এ সব করছে। মানছে না কোন জেল কোড, কোন আইন, কোন কানুন।
কেননা আমি ৩ বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আমি একটি বৃহৎ দলের নেত্রী, আমি সাবেক সেনা প্রধানের স্ত্রী,আমি সাবেক প্রেসিডেন্টের স্ত্রী। সর্বোপরি আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী, আমি একজন বীর মুক্তি যোদ্ধার স্ত্রী এ সবের কোন কিছু ওরা বিবেচনায় না আনলেও অন্তত আমার বয়সের বিষয় ওদের চিন্তায় আসার কথা। আমাকে এখনো কোন ডিভিশন দেয় নি। আমি একজন ৭৩ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা। যার পায়ে সমস্যা,চোখে সমস্যা।আমার মত একজন বর্ষিয়ান মায়ের ওপর, ওরা যে মানসিক চাপ তৈরী করছে তা সহ্য করা খুব কষ্ট কর। শারীরিক কোন কাজ করার শক্তি আমার না থাকলেও মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা আমার মানসিক শক্তি যেন তিনি আগের চাইতে আরো মজবুত করে দেন।
মনে পড়ে, আমার বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর তখন আমার বিয়ে হয়েছিলো। ২১ বছর বয়সে মা হয়েছি। এর পরে ২ সন্তানের জননী। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হয়েছি বিধবা। কাজ পাগল স্বামী আমার দেশ গড়ার কাজে, দেশের মানুষের সেবায় আমৃত্যু সময় দিয়ে গেছেন। যে উন্নত সুখী সুন্দর বাংলাদেশের স্বপন তিনি দেখেছিলেন,গড়তে চেয়েছিলেন তা এগিয়ে নেবার জন্য তাঁর সহকর্মীদের সাথে আমিও তাঁর অসমাপ্ত কাজে যোগ দেই। কিন্তু যতই দিন গড়িয়েছে দেখেছি কাছের মানুষদের বিশ্বাস ঘাতকতা, শঠতা আর দলের প্রতি দেশের প্রতি মোনাফেকদের মোনাফিকতা। দেখেছি কত অল্প প্রাপ্তিতেই তারা নিজদেরকে বিকিয়ে দিয়েছে স্বৈর শাসকের হাতে।কত দ্রুত তারা রং বদলিয়েছে। আবার কত দ্রুত তারা মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে গিয়েছে।
একা হয়ে পড়েছি কিন্তু অন্যয়ের সাথে আপোষ করিনি। যত জন দল ছেড়ে চলে গেছে তার চেয়ে লক্ষ গুন মানুষ দলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যত বেশী দল ভাঙ্গতে চেয়েছে তত বেশী দল মজবুত হয়েছে। দলের ঐক্য গড়ে উঠেছে। দল ও দেশের প্রতি নিবেদিত প্রান নেতা-কর্মি সৃষ্টি হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে বার বার বহুবার। কিন্তু ওরা কখনই আমাকে আমার আদর্শ থেকে আমার বিশ্বাস থেকে টলাতে পারেনি।
আমাকে আমার স্বামী-সন্তানের সৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। জেলে দিয়েছে। আমার দুই সন্তান কে বন্দি করে নির্যাতন চালিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে চেয়েছে। বার বার একই কথা বলেছি, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নাই। বাংলাদেশ আমার প্রথম ও শেষ ঠিকানা। আমি আমার বন্দি দশায় মা হারিয়েছি, ভাই হারিয়েছি , হারিয়েছি দলের অনেক সন্তানকে। তবুও হারায়নি আমার মনোবল। মইনুদ্দিন-ফকরুদ্দিনের অগণতান্ত্রিক অপকর্মের বৈধতা না দিয়ে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছি প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ। অবিচল দাঁড়িয়ে থেকেছি দেশ, দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে। যন্ত্রণার হা হা কারের তীব্র কষ্ট বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে থেকেছি নয়নের মনি ছোট ছেলের কবরের পাশে। তার পরেও মাথা নত করিনি অন্যায়ের কাছে, গনতন্ত্রের হত্যাকারকদের কাছে। দেশের মানুষের ওপর ওদের অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছি। দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে গনতন্ত্রের মুক্তি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছি। কোন লোভ লালসা, ভয় ভীতি ষড়যন্ত্র কোন কিছুই আমাকে আমার দেশের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ইনশাআল্লাহ্‌ পারবে না।
আমার দেশপ্রেমী সন্তানেরা
তোমাদের সাথে আমার এখন যে বিচ্ছিন্নতা তা খুবই সাময়িক। আমি জানি আমার জন্য তোমাদের কষ্ট হচ্ছে। যে দু হাত দিয়ে এই দেশ গড়তে চেয়েছি সেই হাতে ওরা হাত কড়া পরাতে চাইছে। যে পায়ে হেটে বেড়িয়েছি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সেই পায়ে ওরা শেকল দিতে চাইছে। যে চোখ দিয়ে দেখেছি অপরুপ বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষকে। সেই চোখ ওরা বন্দি করেছে চার দেয়ালের মাঝে। ওরা আমাকে বন্দি করলেও আমার মনোবল আমার বিশ্বাসকে বন্দি করতে পারেনি। আমার এই দৃঢ় মনোবল, কারণ আমি কোন অন্যায় করিনি, কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি, কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ করিনি। আজ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের জালে ওরা আমাকে বন্দি করেছে, আমি জানি ওরা আমার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে কিন্তু আল্লাহ্‌ যার সহায় তার ভয় কিসের ? বাংলাদেশের মানুষ যার পাশে আছে তার শঙ্কা কিসের ? ইনশাল্লাহ রাহমানির রাহিম আমাকে সকল অসম্মান বিদ্রুপ মিথ্যাচার থেকে রক্ষা করবেন। ইনশাআল্লাহ্‌ অচিরেই তিনি আমাকে তোমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনবেন।
এ সময় তোমাদেরকে কঠিন ধর্য্য ধরতে হবে। নিজেদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সকল মান অভিমান ভুলে, ভাইয়ে ভাইয়ে এক হয়ে এক সাথে কাজ করতে হবে। দলের ঐক্যে যেন কেও চিড় ধরাতে না পারে। সকল প্রকার গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল ভাবে চালিয়ে যেতে হবে। শত্রু-মিত্র চিনে চলতে হবে। কাওর পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না।
আমি জানি আমার সন্তানেরা পরীক্ষিত। ন্যায় কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎ সাহস ও যোগ্যতা আমার সন্তানদের আছে। কোন অন্যায়ের কাছেই তারা মাথা নত করেনি এবং করবে না। মায়ের প্রতি তাদের সম্মান ও ভালোবাসা প্রশ্নাতীত।
মনে রেখ, তোমাদের এই বৃদ্ধা মায়ের চাওয়া বা পাওয়ার কিছু নাই। মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীনের কাছে একটাই দোয়া দ্রুত যেন তোমাদের মাঝে ফিরে দেশ গড়ার কাজে যোগ দিতে পারি। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি।
প্রিয় সন্তানেরা,
শেষ রজনীর নামাজ শেষে আবার লিখতে বসলাম। এ সময় আল্লাহতালা সরাসরি বান্দার কথা শুনতে পান। দোয়া কবুল করেন। দেশ, দেশের মানুষ, তোমাদের এবং নিজের জন্য দোয়া করেছি। তোমাদের সবার মুখ খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে নাতনীদের কথা। ওরা কত দূরে। কত দিন দেখিনা ওদের হাসি মাখা মুখ। সেই কবে থেকেতো একাই ছিলাম। ছিলাম তোমাদের মাঝে। একই শহরে থেকেও আমি তোমাদের অনেক দূরে। এখন রাত প্রায় শেষ। মনে হয় ভোর হতে চলেছে। দুর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। বাইরে পাহারারত প্রহরীদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। হয়তো ওদের পরিবর্তনের সময় হয়েছে। আমিও চেয়ে আছি শুভ্র সুন্দর নুতন ভোরের প্রত্যাশায় এক পরিবর্তনের অপেক্ষায়।
আমার প্রান প্রিয় সন্তানেরা, তোমারা ভালো থেকো, নিরাপদে থেকো। আমার ভালোবাসা ও আদর নিও।

ইতি
তোমাদের মা

(চার পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার আলোকে কল্পনা প্রসূত একটি লেখা। এর দায় দায়িত্ব সম্পুর্ন লেখকের। এ লেখা তাদের জন্য যাদের হৃদয়ে রয়েছে বন্দিনী মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। এ লেখা তাদের জন্য নয় যারা মতলব বাজ ও এক চোখা – আশিক ইসলাম)

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার