আজকে

  • ৯ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৩শে জুন, ২০১৮ ইং
  • ৮ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

মন্ত্রণালয় অসহায়, কঠোর হতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

Published: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮ ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৮ ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
 

সপ্তাহজুড়ে ঘোষণা দিয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব চেষ্টা চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা ফেসবুকে প্রশ্নের বিনিময়ে টাকা চাইছে। কিন্তু ফাঁসকারীরা ধরা পড়ছে না, দু-একজন ধরা পড়লেও মূল উৎস বের করা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অসহায় হয়ে পড়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার শক্তভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে এ বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা মিলছে না। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক এবং ম্যাসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ ফাঁস করা প্রশ্নপত্র ছড়ানোর মূল মাধ্যম হলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিটিআরসি) ভূমিকা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত সোমবার জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এরপর মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।

পরে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী তাঁর পদ থেকে সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে আরও শক্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দিয়ে আর কী ধরনের সহায়তা দরকার, তা জানতে চান।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন জাতীয় পার্টির সাংসদ জিয়াউদ্দিন আহমেদ। পদত্যাগ না করলে তাঁকে বরখাস্ত করতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান তিনি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা মনে করছেন, এবার যেটা হচ্ছে তার পেছনে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না।

ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ছড়ানো বন্ধে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়গুলো বিটিআরসি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফেসবুক বন্ধ বা এ-সংক্রান্ত কোনো বিষয়বস্তু বন্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা পাওয়ামাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন প্রথম আলোকে বলেন, যারা আগাম ঘোষণা দিয়ে এসব করছে, তাদের উদ্দেশ্য শুধু প্রশ্ন ফাঁস নয়, তারা চক্রান্ত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। শিগগিরই এদের ধরা হবে।

কড়াকড়ির মধ্যেও ফাঁসের আগাম ঘোষণা
এত কড়াকড়ির মধ্যেও আজ বুধবার অনুষ্ঠেয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়া যাবে বলে ফেসবুকে আগাম ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ‘এসএসসি এক্সাম কোয়েশচান অ্যান্ড সাজেশন ২০১৮ (ইংরেজিতে লেখা) ’ নামে একটি গ্রুপে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ইংরেজি প্রথম পত্র প্রশ্ন দিলাম সবার আগে, আবারও একটা প্রমাণ দিলাম, কারও ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন লাগলে ইনবক্সে ৫০০ টাকা লাগবে। অবশ্যই অগ্রিম করতে হবে।

এক ব্যক্তি ম্যাসেঞ্জারের একটি গ্রুপে প্রশ্ন দেওয়ার কথা বলে ৫০০ টাকা চেয়ে একটি বিকাশ নম্বর দিয়েছে।

এভাবে প্রতিদিন আগাম ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ প্রচারণা চালালেও ওই চক্রকে ধরা যাচ্ছে না।

গত ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। এ পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ২০ লাখের বেশি। এবার শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আগেভাগে ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হচ্ছে। গত রোববার প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর পরদিনই মানিকগঞ্জে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার হলেও মূল উৎস মিলছে না
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিঙ্গাইর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে গত সোমবার ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষার আগমুহূর্তে ফ্রেন্ডস কোচিং সেন্টারের শিক্ষক রুবেল হোসেন ও শরীফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।

সিঙ্গাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার ইমাম হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসায় এই দুজন জানিয়েছেন, রাজিব নামে ঢাকার এক ব্যক্তির ফেসবুক থেকে তাঁরা ওই প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। তবে রাজিব সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারেনি পুলিশ।
গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের মোবাইলে ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন ছিল। পরীক্ষা শুরু হলে দেখা যায়, মোবাইলে থাকা প্রশ্ন ইংরেজি প্রথম পত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মামলার এজাহারে এসব তথ্য উল্লেখ করেছেন মামলার বাদী ওই পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব মো. আকরাম হোসেন।

গ্রেপ্তার রুবেল হোসেনের বাড়ি জেলার সাটুরিয়া কামতা গোলড়া গ্রামে। বাবার নাম হুমায়ুন কবির। মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গত বছর স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। আর সানাইল গ্রামের ফরহাদ আলীর ছেলে শরিফ একই কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে গত বছর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁরা দুজন উপজেলার চারাভাঙ্গা এলাকায় ফ্রেন্ডস কোচিং সেন্টারটি গড়ে তোলেন। তাঁরা ওই কোচিং সেন্টারের কয়েকজন ছাত্রসহ কিছুসংখ্যক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সরবরাহ করার চেষ্টা করেন।

ফরিদপুরের ঘটনাও ফেসবুককেন্দ্রিক
ফরিদপুর অফিস জানায়, গত শনিবার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে এক পরীক্ষার্থী ও তার বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা এখন ফরিদপুর কারাগারে রয়েছে। তাদের ট্যাবে প্রশ্ন পাওয়া যায়। ফেসবুক থেকে তারা এই প্রশ্ন সংগ্রহ করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ট্যাবে পাওয়া প্রশ্ন এবং হলে সরবরাহ করা প্রশ্নের মধ্যে প্রায় হুবহু মিল পাওয়া যায়।

গত শনিবার ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের এসএসসি পরীক্ষার ভেন্যু কেন্দ্র ব্রাহ্মণকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পরীক্ষার্থীদের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, সেটা আগে জানতে হবে। কারণ, চাহিদা আছে বলেই জোগান আছে। আর চাহিদা হওয়ার কারণ এতগুলো পাবলিক পরীক্ষা।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এত পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। এমসিকিউ একেবারে কমিয়ে দিতে হবে। কোচিং বন্ধ করে দিতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করতে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার