আজকে

  • ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং
  • ১২ই মুহাররম, ১৪৪০ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

কোন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পরার মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি !

Published: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৩, ২০১৮ ২:০৩ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৩, ২০১৮ ২:০৫ পূর্বাহ্ণ
 

দেওয়ান ফয়সলঃ

গত কয়েক মাস যাবত খবরের কাগজের পাতাগুলো এবং অনলাইন, ফেইসবুক সহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় যেসব খবর প্রচারিত হচ্ছে এর মধ্যে আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে যে লেখাগুলো ছাপা হচ্ছে সেগুলোই হচ্ছে এখন বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সব বাঙালী অধ্যুষিত এলাকায় ”টক অব দ্যা কান্ট্রি” অর্থাৎ দেশের প্রধান আলোচ্য বিষয়। আর হবেই না কেন? কারণ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। আর এই শিক্ষা ব্যাবস্থায়ই যদি ভূমিকম্প শুরু হয় তা হলে একটা জাতি পুরোদমেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা আমার কথা নয়, বড় বড় মনিষিদের কথা। কিছুদিন আগে একটি অনলাইন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে-”আফ্রিকার সবচেয়ে নামকরা ্িবশ্ববিদ্যালয়টির নাম হচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা যার সিংহদ্বারে লেখা রয়েছে কোন জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। বরং সেই জাতির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রতারণার সুযোগ দিলেই হবে। কারণ এভাবে পরীক্ষা দিয়ে তৈরী হওয়া ডাক্তারদের হাতে রোগীর মৃত্যু হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা তৈরী দালান-কোঠা,ইমারত ধ্বংস হবে এবং অর্থনীতিবিদদের দ্বারা দেশের আর্থিক খাত দেউলিয়া হবে। এছাড়া বিচারকদের হাতে বিচারব্যবস্থার কবর রচনা হবে। সুতরাং শিক্ষা ব্যবস্তা ভেঙ্গে পরার মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি।”
উপরের সত্য বানীটি পড়লে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা খবরের কাগজগুলোতে পড়লে মনের মাধ্যে প্রশ্ন জাগে তাহলে কি আমাদের বাংলাদেশও সেই অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে? উপরের কথাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের হসপিটাল, প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে রোগিদের সাথে ডাক্তারদের ব্যবহার, তাদের চিকিৎসা সেবার মান দেখলে অনেকে ভয়ে আতকে ওঠে। মহিলার সন্তান প্রসব করাতে গিয়ে ডেলিভারীর সময় হয়তো বা অপারেশনের কাচি বা তোয়ালে পেটের ভেতর রেখেই পেট সেলাই করে নেয়া, বিনা দরকারে অতিরিক্ত দিন ক্লিনিকে রেখে দিয়ে টাকার বিল বড় করা সব খবর তো ভুক্তিভোগী সহ দেশী-বিদেশী আত্মীয় স্বজনদের জানাই আছে। বাংলাদেশে এসব ঘটনা তো এখন নিত্যদিনের। এবার আসা যাক ইঞ্জিনিয়ারদের কথায়। বিভিন্ন সময়ে ছবি সহ পত্রিকার খবরের পাতায় দেখেছি, রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে রাস্তা-ঘাট,দালান কোঠা তৈরী হচ্ছে অথচ বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা বড় অংকের বিনিময়ে কন্ট্রাকটারদের কাজ মারভেলাস হয়েছে বলে সাইন করে দিয়ে টাকা উঠিয়ে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে যাচ্ছে। তারা কি একবার সাধারণ জনগণের জানমালের কথা চিন্তা করছেন? তাদের কথা হলো মানুষ মরলে আমাদের কি? এছাড়াও দেশের অর্থনীতি এবং আইন ব্যবস্থায় যে ধ্বস নেমে এসেছে এসব নিয়ে তো বড় বড় কলামিষ্ট এবং লেখকরা নিয়মিত লিখেই যাচ্ছেন। কিন্তু ফল কি হচ্ছে? মনে হয় যেন কার গোয়ালে কে ধোঁয়া দেবে?
কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলার এক আর্টিকেলে পড়লাম ”বাংলাদেশে প্রাাথমিক স্কুলে গণিত এবং ভাষা শিক্ষার ভয়াভহ চিত্র” শিরোনামে ছাপা হয়েছে- ”বাংলাদেশে শিক্ষার মান নিয়ে সরকারের পরিচালিত এক গবেষণা বলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষার মাত্র ৪০ শতাংশ স্কুল থেকে পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন শীর্ষক এই গবেষণায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান নিয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। পঞ্চম শ্রেণীর ৯০ শতাংশ পরীক্ষার্থীরই গণিত শিক্ষার মান নি¤œ। অন্যদিকে, তৃতীয় শ্রেণীর ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্র্থীই বাংলা ভাষা শিক্ষার মান নি¤œ।
বাংলাদেশে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০০। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ। ফলে শিক্ষা গবেষকরা বলেন, এই স্কুলের শিক্ষার মানের সাথে দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা গবেষক রাশেদা কে চৌধুরী বিবিসি’কে বলেছেন, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মান এবং অপ্রতুলতা খুবই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, তাদের পরিচালিত ২০১৫ সালে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে স্কুলে শিক্ষা না পেয়ে শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়েছে।
সরকারের প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গিয়াস উদ্দিন আহমদ বিবিসি রিপোর্টর রাকিব হাসনাতকে বলেন, তারা এই গবেষণার ফলাফল গ্রহণ করেছেন এবং সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করছেন। তবে একজন প্রাথমিক শিক্ষক বলেছেন, এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ শিক্ষক স্বল্পতা। ঢাকার আমতলী স্টাফ কোয়ার্র্টার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিবিসি রির্পোর্টরকে জানান তার স্কুলে ৫২৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র ১০ জন। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে গড়ে ৫০ জনেরও বেশী শিক্ষার্থীকে সামলাতে হয়। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ঝরে না পড়ার দিকে নজর দিলেও, শিক্ষার মান নিয়ে দিন দিন আশংকা তৈরী হচ্ছে।”


শুধুমাত্র এই রিপোর্টগুলোই আমাকে শংকিত করে তুলেনি, আমাকে আরও বেশি শংকিত তুলেছে আমাদের মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর কিছু মন্তব্য শোনে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ”প্রশ্ন ফাঁস রোধে এমন কোনো চাবি নেই যে, তা ঘুরালেই এটি বন্ধ হয়ে যাবে।” এদিন সচিবালয়ে মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রম উন্নতকরণ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করে মন্ত্রণালয়ণ। মন্ত্রী মহোদয় আরও বলেন, সব সময়ই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে আমার সস্পর্কের বয়স ৬০ বছর, তখন থেকেই তা দেখে আসছি। কিন্তু ঐ সময় তো আর সামাজিক মাধ্যম ছিলোনা, যে করণে প্রচার কম হয়েছে। বর্তমানে ডিজিটালের বদৌলতে তা বেশি বেশি প্রচার হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রী আরও বলেন, আগে বিজি প্রেশ থেকে প্রশ্ন ফাঁস হতো। কিন্তু এখন কিছু অনৈতিক চরিত্রের শিক্ষক তা করছেন।
সম্প্রতি যমুনা টিভির এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের আর এক নমুনা। নোয়াখালীর একটি স্কুলে যমুনা টিভির একজন সাংবাদিক এবং তাঁর সাথে একজন ক্যামেরাম্যান ঐ স্কুলের শিক্ষকদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন। ঐ ইন্টারভিউয়ে দেখা যায় শিক্ষকরা প্রথমে স্বীকার কার না করলেও পরে তারা এ কথা স্বীকার করেছেন যে, ৫০০ টাকা দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের উপরের ক্লাশে প্রমোশন দেয়া হয় এবং গরীব ছাত্রদের অভিভাবকরা যারা টাকা দিতে না পারেন তাদের ছেলেমেয়েদের প্রমোশন দেয়া হয়না। অর্থাৎ প্রাথমিক স্কুল থেকেই এসব ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারে যে, টাকা দিলেই তো পাশ। সুতরাং এতো কষ্ট করে লেখাপড়া করাার দরকার কি? ছোট বেলা থেকেই যেসব ছাত্র ছাত্রীদের মাথায় এই টাকার খেলা ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাদের কাছ থেকে দেশ কি আশা করতে পারে? এ ব্যাপারে ঐ সাংবাদিক একজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে এব্যাপারে জানতে চাইলে, তিনি বলেন এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। তবে তদন্তের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তা প্রমাণিত হলে শিক্ষার্থীদের এসব টাকা ফেরত দেয়া হবে। এর বেশী তিনি আর কিছু বলেননি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অঙ্কুরেই যে সব ছাত্রছাত্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে এর জন্য দায়ী কে? আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী সহজ সরল ভাবে একটি কথা বলেছেন, যারা খুন খারাবী করছে তাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্য্যন্ত দেয়া হচ্ছে, তাই বলে কি খুন খারাবী বন্ধ হচ্ছে? অর্থাৎ তিনি আমাদের বুঝাতে চাচ্ছেন, এসব চক্রের বিরুদ্ধে আইন করেও কোন লাভ হবেনা। এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আল্লাহর হাওলা করে দিলাম। এখানে তিনি তাঁর এই মন্ত্রীত্বের পদে অসহায়তাই প্রমাণ করে দিলেন। সুতরাং এই পদে তিনি কি আর থাকার কোন অধিকার রাখেন?
এই প্রশ্ন ফাঁসসহ শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে দুদক ৩৯ টি সুপারিশনামা পেশ করেছে। এসব সুপারিশ নামার মধ্যে রয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য সহ শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও দুর্নিতি বন্ধ সহ এই ৩৯টি সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক টীমের অনুসন্ধানের পর সরকারের কাছে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর প্রেরণ করেছেন দুদক সচিব ড.ম. শামসুল আরেফিন।
দুদক সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবি মহল যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার এই বেহাল দশায় চিন্তিত সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে দেশবাসী হতাশ। এগুলো রোধ করার পরিবর্তে বরং দেখা যায়, সরকার বিভিনাœ গ্রামে গঞ্জের প্রাথমিক স্কুলগুলোকে হাই স্কুল, হাই স্কুলগুলোকে কলেজ, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্য্যাদা দিয়ে এলাকাবাসীর বাহবা কুড়াচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কিন্তু ফলাফল হচ্ছে উল্টো। এসব স্কুল-কলেজগুলোকে প্রমোট করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সুন্দর, সুদৃশ্য দালান-কোঠা তৈরী করা হচ্ছে, ক্লাশরুম করা হচ্ছে, অর্থাৎ এগুলোর মান উন্নয়ন সরকার করছে ঠিকই কিন্তু শিক্ষাদান করবে কে? সরকার এসব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উন্নতমানের শিক্ষা দানের জন্য যে পরিমাণ শিক্ষক, লেকচারার, প্রফেসার দরকার, শিক্ষামন্ত্রণালয় তার কি কোন ব্যবস্থা করেছেন? সে কথাটা কি একবার তারা ভেবেও দেখেছেন? আমার তো মনে হচ্ছে, এসব কিছুই যে দরকার, তা তারা চিন্তাও করতে পারেননি। কারণ তারাওতো বর্তমান শিক্ষা-ব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে এই পজিশনে এসে পৌছেছেন। সুতরাং সরকারের লাখ লাখ টাকা গচ্ছা দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন হচ্ছে দেখাতে গিয়ে সাধারণ জনগণের সাথে এসব টালবাহানা করার দরকার কি?
মুলত; বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ধ্বস নেমে আসছে সে বিষয় নিয়ে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী, তাদের অভিভাবক সহ বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ জেগে ওঠেছেন। সব জায়গাতেই এসব অনিয়মকে প্রতিহত করে দেশের মেরুদন্ড আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচানোর তাগিদে সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেন সেটাই দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। এছাড়াও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার পেছনে কোন কালো হাতের ইশারা কাজ করছে কি না তাও খতিয়ে দেখার জন্য দুদক সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ রইলো।

দেওয়ান ফয়সল
সাংবাদিক ও লেখক
কার্ডিফ,ইউকে।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার