আজকে

  • ৯ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৩শে জুন, ২০১৮ ইং
  • ৭ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

উত্তেজনা আর উদ্দীপনায় ট্রাম্পময় ২০১৭ সাল

Published: সোমবার, জানুয়ারি ১, ২০১৮ ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: সোমবার, জানুয়ারি ১, ২০১৮ ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ
 

মোঃ মাহমুদুর রহমান:

শীতের শুরুতে ঝরা পাতার মতো ২০১৭ সাল চলে গেল বিশ্ববাসীর জীবন থেকে। সময় চলে যায় ঠিকই, তবে ঐ সময়ের কর্মকান্ডের ফলাফল নতুন বছরের পথ ধরে অনাগত সময়ের দিকে বহমান থাকে। বিদায়ী বছরের শুরুতে ২০ জানুয়ারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে। এ নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্ধী হিলারী ক্লিনটনের চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ কম ভোট পেয়েও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ইলেক্টরাল কলেজ ভোট বেশি পেয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জটিল নির্বাচন পদ্ধতির মারপ্যাচে ট্রাম্প নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে রাশিয়ার অনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে যা বছর জুড়ে রিপাবলিকানদের জন্য অস্বস্তির কারণ ছিল। আবার ট্রাম্পের সব নীতিও তাঁর নিজ দল রিপাবলিকানদের অনেকের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়। ঘরে বাইরে প্রচুর সমালোচনাকারী থাকলেও দমে যাওয়ার পাত্র নন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর নীতিতে তিনি সব সময় অবিচল। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যেসব ওয়াদা করেছিলেন জনগনের সাথে তা বাস্তবায়নে প্রথম থেকেই তিনি কঠোর হন। নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম অভিবাসীদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মেক্সিকোর সাথে প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে আমেরিকায় বৈধ এবং অবৈধ অভিবাসী নিয়ন্ত্রণে তাঁর চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না বিদায়ী বছরে। ইরানের পরমাণু চুক্তি এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়েও ট্রাম্প ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। উত্তর কোরিয়ার প্রতি হুংকার ও পাল্টা হুংকারে মনে হয়েছিল যেকোনো সময় পরমাণু য্দ্ধু লেগে যেতে পারে। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সব সময়ই মার্কিন মুল্লুকে পরমাণু হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। জবাবে ট্রাম্পও এ রকম হুমকির করুণ পরিণতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট কিমকে বারবার সতর্ক করছিলেন। কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র এরকম হুমকি অগ্রাহ্য করতে পারে না। তাই যুদ্ধ অত্যাসন্ন। আবার কিছু বিশ্লেষকের ভিন্নমত ছিল। তাদের মতে যেহেতু উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র রয়েছে তাই যুদ্ধ হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ ভূখন্ডে কোনোরকম ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে যুদ্ধ করবে না। ২০১৭ সালে ভিন্নমতের বিশ্লেষকদের ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। চলতি বছরের হিসাব-নিকাশ কোন পক্ষে যায় তা কেবল বছর শেষেই বলা যাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বক্তব্য বিবৃতি নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও জেরুজালেম ঘোষণা ছিল এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ৬ ডিসেম্বর ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এ ঘোষনার পর সারাবিশ্ব এর নিন্দায় সোচ্চার হয়। যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একঘরে হয়ে পড়ে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৫ সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকী ১৪ টি দেশই ট্রাম্পের ঘোষণার বিপক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতার বলে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবটি পাস হতে দেয়নি। তারপর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ওআইসির সম্মেলন ডাকেন। ৫৭ দেশের এ সংস্থাটি ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে। মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থা ওআইসির জন্ম হয়েছিল ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের জেরুজালেম দখলের প্রেক্ষিতে। তাই সংস্থাটির তড়িৎ ও কঠোর প্রতিক্রিয়া কারো কাছেই অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। তবে অবাক হওয়ার বিষয় ছিল সৌদি আরব ও মিশরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র যারা ওআইসিতেও প্রভাবশালী ছিল তাদের প্রতিক্রিয়ায়। তারাও যুক্তরাষ্টের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে কঠোরভাবে। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল মিশর। এছাড়া বিশ্বে ইসরাইলের পর সবচেয়ে বেশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সাহায্যও পেয়ে থাকে মিশর।ওআইসির প্রতিক্রিয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর দিন ছিল ২১ ডিসেম্বর। জেরুজালেম ইস্যুতে ওইদিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা প্রত্যাখান করে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১২৮ টি দেশ। প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ট্রাম্পের ঘোষণার পক্ষে ভোট দেয় মাত্র ৯ টি দেশ। দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, মাইক্রোনেশিয়া, নাইরু, পালাউ এবং টোগো। তবে ভোট দানে বিরত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিবেশি কানাডা, মেক্সিকো সহ ৩৫ টি দেশ। নিকট অতীতে বিশ্ব দরবারে কোনো ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতো প্রান্তিক অবস্থানে ছিল না। সাধারণ পরিষদে ভোটের আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হ্যালি মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরোধীতাকারীদের প্রতি হুশিয়ারি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন এবং কারা কারা বিপক্ষে ভোট দেয় তাদের তালিকা পর্যবেক্ষণে থাকবে বলেও জানানো হয়। ভবিষ্যতে এসব দেশে আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে না বা কমানো হবে বলে জানানো হয়। এসব হুশিয়ারি ও পরোক্ষ হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে জাতিসংঘ জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্পকে নাকচ করে দেয়। ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়ে মার্কিন প্রতিনিধি নিকি হ্যালি বলেন, আজকের দিনটি যুক্তরাষ্ট্র মনে রাখবে। ট্রাম্পও বলেন, ভালোই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় হবে। ট্রাম্পের ঘোষণা ও বিশ্ব দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হওয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রে দূতাবাস স্থানান্তরের বিল (এস ১৩২২) প্রতিনিধি পরিষদে ৩৭৪-৩৭ ভোটে এবং সিনেটে ৯৭-৫ ভোটে পাশ হয়। এই আইনে ১৯৯৯ সালের ৩১ মে’র মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের একটা সুযোগ ছিল যদি তারা মনে করেন এরকম স্থানান্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর তাহলে তারা কংগ্রেসে রিপোর্ট পেশের মাধ্যমে সময় নিতে পারেন। ১৯৯৫ সাল থেকে সব প্রেসিডেন্টই দূতাবাস স্থানান্তরের ওয়াদা করে নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তার অজুহাতে ওয়াদা পূরণ করেননি। ব্যতিক্রম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জনগণকে দেয়া ওয়াদা প্রথম বছরেই পালন করেছেন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনপ্রিয় ইস্যুটির নিষ্পত্তি হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ারই কথা।তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া যদি কার্যকর হয় এবং স্থায়ীত্ত্ব পায় তাহলে ট্রাম্প বেকায়দায় পড়তে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ নাগরিকের কোনো আপত্তি নেই ট্রাম্পের কাজে যদি তাদের দৈনন্দিন জীবন নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের একজন হাইস্কুল ছাত্রীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায়, ট্রাম্প যখন ৬ ডিসেম্বর ঘোষণাটি দেন তখন তাদের ইতিহাসের ক্লাস চলছিল। ইতিহাসের শিক্ষক অনলাইনে ঘোষণাটি দেখে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ছাত্রদের মতামত চান। তারা আলোচনায় রাজী হলে শিক্ষক তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করতে বলেন। ক্লাসে সংখ্যালঘু ইহুদি ও মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসগত কারণে বিপরীত মতামত প্রকাশ করলেও বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী এ বিষয়ে ছিল ভাবলেশহীন। তবে তারা উদ্বিগ্ন ছিল ট্রাম্পের এ ঘোষণায় যদি কোনো নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে তাহলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। শিক্ষক তাদের স্মরণ করিয়ে দেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা, যখন বাধ্যতামূলকভাবে তরুণদের যুদ্ধে যেতে হতো। আজও এমন অবস্থা হলে হয়তো হাইস্কুল ছাত্রদের বাধ্যতামুলকভাবে যেতে হতে পারে। মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ সংঘাতের কারণে মার্কিন ঘোষণার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের মৃত্যুর মিছিল হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হবে। রক্ত পিচ্ছিল পথ দিয়েই হয়তো ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে এ ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার নৈতিক অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গিয়েছে বলেই অনেকের ধারণা। ট্রাম্পের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কথা ও কাজের মধ্যে মিলের একটি উদাহরণ। আবার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ’আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সা্েযথ সাংষর্ষিক এ ঘোষণা। জেরুজালেম ঘোষণা ইসরাইলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলেও বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বের ভিতকে উপড়ে ফেলেছে। কারো কারো মতে, ৬ ডিসেম্বরের জেরুজালেম ঘোষণার পথ ধরে ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিশ্বজনমত প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হয়েছে মার্কিন মোড়লিপনা অবসানের দিন। তবে মার্কিন জনগণের প্রকৃত মতামত জানা যাবে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। এই নির্বাচনে তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে গ্রিন সিগনাল দিতে পারে আবার রাশ টেনে ধরতেও পারে। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে উত্তেজনা ও উদ্দীপনায় শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। আরও একটু অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ও কলাম লেখক

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার