Thursday, December 7, 2017 8:29 PM
 
 

স্কটল্যান্ডে ৪০ বছর পর বাংলাদেশী হত্যা মামলার রায়:বশির আহমদকে হত্যার দায়ে পাকিস্তানী শেফের ১৬ বছরের জেল

প্রকাশিত: December 6, 2017 2:46 pm   আপডেট: December 7, 2017 at 8:29 pm
 

মিজান রহমান (এডিনবরা):

১৯৭৮ সালের ১৩ অক্টোবর শুক্রবার। রেস্টুরেন্টে জন্য সপ্তাহের মধ্যে এটি একটি ব্যাস্ততম দিন। আবারডিনে তখন সবেমাত্র ৩-৪ টি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। সদ্য চালু হওয়া বাংলাদেশী মালিকানাধীন রাজ দুলাল রেষ্টুরেন্টটি তখন বেশ জনপ্রিয় । শুক্রবার বিকেলে রেষ্টুরেন্ট খোলার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই কাষ্টমারে প্রায় পরিপুর্ন। কাস্টমারের চাপ সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছেন সবাই। কিচেনের ২ জন স্টাফই সেদিন কাজে অনুপস্থিত। নোটিস ছাড়াই তান্দুরী শেফ পালিয়েছে । রেষ্টুরেন্টে শেফ ও (বস) শুক্রবার রাতে আসেননি সীমিত সংখ্যক স্টাফ মিলে অনেক কষ্ট করে সে রাতটিকে ম্যানেজ করেন মাসুক মিয়া।
…স্মরনীয় সেই বিকেলের অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ননা করেন রাজ দুলাল রেষ্ঠুরেন্টের পার্টনার আবারডিনের প্রবীন ব্যাক্তিত্ব মাসুক মিয়া। তার দেশের বাড়ী মৌলভীবাজার জেলার গয়ঘর গ্রামে। রেষ্টুরেন্টের ৪ জন পার্টনারের মধ্যে ২ জন থাকতেন আবারডিনে। মাসুক মিয়া ছাড়াও অন্য পার্টনার ছিলেন শেফ কাজী বশির আহমদ। সবার বাড়ী মৌলভীবাজার জেলায়। কাজী বশির আহমদ ও কয়েকজন কর্মচারী মিলে একসাথে থাকতেন আবারডিন শহরের একটি স্টাফ ফ্লাটে। রোজমাউন্ট ভায়াডাক্টের ১ম তলার ফ্লাটটিতে ছিল ৩ টি রুম। বস হিসাবে বশির আহমদ থাকতেন একটি আলাদা রুমে। অন্য দুই রুমে স্টাফদের সাথে থাকতেন সদ্য কাজে যোগ দেয়া পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত তান্দুরী শেফ রিয়াসত খান।
মাসুক মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৮ সালের ১৩ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে পাকিস্তানী তান্দুরী শেফ রিয়াছত খান কাজ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার সময় স্টাফ ফ্লাটের অন্যদের সে বলেছিল যে কাপড় নিয়ে লন্ড্রীতে যাচ্ছে ।
কয়েক ঘন্টা পর বিষয়টি জানতে পান মাসুক মিয়া। তিনি ধারন করেন কাজের চাপে হয়ত তান্দুরী শেফ হয়ত পালিয়েছে। তাকে খুজতে তিনি আবারডিন ট্রেন স্টেশনে যান । কিন্তুু পাওয়া যায়নি রিয়াসত খানকে । তখনকার দিনে স্টাফ পালিয়ে যাওয়ার ঘঠনা প্রায়শই ঘটত।
ওদিকে শুক্রবার রাতে রেষ্টুরেন্টের শেফ অর্থাৎ কাজী বশির আহমদ অনুপস্থিত থাকায় অন্যরা ধারনা করেছিলেন যেহেতু তিনি বস হয়ত কোন জরুরী কাজে কোথায় গেছেন। সে সময় মোবাইল ফোনের ও তেমন প্রচলন ছিল না। এ নিয়ে কেউই খুব একটা চিন্তিত ও ছিলেন না। স্টাফ ফ্লাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করে মাসুক মিয়া জানতে পারেন উনার রুমের দরজা বন্ধ। তখন তিনি মনে মনে আশংকা করছিলেন কাজী বশির আহমদ হয়ত কাউকে না জানিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ আবার বলছিলেন হয়ত কোন আত্বীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়াতে গেছেন। শুক্রবার রাজ- দুলালে কাজ শেষ করে যে যার মত বাসায় ফিরে যান।
পরদিন শনিবার বিকেলে মাসুক মিয়া বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে যখন খোজ নিচ্ছিলেন তখন জনৈক আত্বীয় জানালেন বশির আহমদের পাসপোর্ট তাদের বাসায়। তখনই এটা পরিষ্কার হল যে তিনি বাংলাদেশে যাননি। এর ফলে সবার মধ্যে একটু উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। কিন্তুু শনিবারে রেস্টুরেন্টে কাজের ব্যাস্ততায় বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবার তেমন সুযোগ পাননি কেউই।
রোববার ১৫ ই অক্টোবর সকালে স্টাফ ফ্লাটে ছুটে যান মাসুক মিয়া। ফ্লাটের অপর বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে বশির আহমদের রুমটি সার্চ করার উদ্যোগ নেন তিনি। ধারনা ছিল রুমের মধ্যে তিনি কাপড় চোপড় কিংবা ব্যাগ আছে কিনা সেঠা পরীক্ষা করা।
কিন্তুু রুমে ঢুকেই সবাই হতবাক। বসা অবস্থায় লাশ হয়ে পড়ে আছেন কাজী বশির আহমদ। মুখমন্ডল কাপড়ে আবৃত এবং পিছমোড়া করে হাত বাধা। এ দৃশ্য দেখে মাসুক আহমদ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পুলিশে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয় তৎক্ষনাৎ। তোড়েজোড়ে শুরু হয় পুলিশী তদন্ত। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে লাশের বুকে ও ফুসফুসে একাধিক ছুরির আঘাতের আলামত মেলে। পুলিশের ধারনা শুক্রবার ভোর রাতের দিকে ঘঠনাটি ঘঠেছে।
খুনের সন্দেহে রিয়াসত খানের খোজে তখন মরিয়া হয়ে ওঠে গ্রাম্পিয়ান পুলিশ। ট্রেন, বাস, ট্যাক্সী সহ ব্রিটেনের বিমান ও নৌ বন্দরে বিশেষ তল্লাশী অভিযান শুরু হয়। কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই ব্যার্থ হয়।
কাজী বশির আহমদের সন্তান সম্ভাবা স্ত্রী ও পরিবার তখন বাংলাদেশে। শোকে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাংলাদেশী মানুষ। তখনকার সময় হাতে গোনা কয়েকটি বাংলাদেশী পরিবার থাকতেন আবারডিনে।
ঘঠনার বিবরনে জানা যায়, রিয়াছত খান শুক্রবার পালিয়ে আবারডিন থেকে ট্রেনযোগে এডিনবরা পৌছান। হে-মার্কেট স্টেশনের পাশে অবস্থিত একটি জুয়ার দোকানে ৯০০ পাউন্ড ব্যায় করেন তিনি। ধারনা করা হচেছ খুন করে পালিয়ে আসার সময় সে বশির আহমদের টাকা চুরি করে নিয়ে আসে।
পরে লন্ডন থেকে ডোবার হয়ে ফেরীযোগে যান ইউরোপ। ফ্রান্স, ইটালী ও গ্রীসে ৮ মাস অতিবাহিত করে রিয়াসত খান চলে যান তার নিজ দেশ পাকিস্তানে।
এর এক যুগ পর ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে রিয়াসত খান আবার ফিরেন ব্রিটেনে। সপরিবারে থাকতেন ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে। তার ধারনা ছিল খুনের তদন্ত থেকে তিনি এখন সম্পুর্ন ভাবে মুক্ত। এভাবে কেঠে গেল আরও ১৬ বছর ।
২০১৬ সালের মে মাসে হলিডে তে পাকিস্তান রওয়ানা হন রিয়াসত খান। বার্মিংহাম এয়ারপোর্টে আমিরাতের একটি ফ্লাইটে চেপে বসেন তিনি। টেইক অফের একটু আগে পুলিশ জানতে পারে পুরনো মামলার একজন পলাতক আসামী বিমানে রয়েছেন। ৩৯ বছর পালিয়ে থাকার পর খুনের সন্দেহে গ্রেফতার হন কাজী রিয়াসত।
পুলিশ স্কটল্যান্ডের বিশেষ টীম নতুন করে শুরু করে মামলার তদন্ত। গোয়েন্দারা অক্ষত অবস্থায় খুজে পান পুরনো সব আলামত, ফিঙ্গার প্রিন্ট এবং সাক্ষীদের জবানবন্দী। ফরেনসিক পরীক্ষা -নিরীক্ষা শেষে খুনের সাথে রিয়াসত খানের সংশ্লিষ্টতার সকল প্রমান খুজে পায় গোয়েন্দারা। জুরী দের উপস্থিতিতে এডিনবরা হাইকোর্টে ৫ দিন ব্যাপী চলে মামলার শুনানী। রিয়াসত খান (৬৩) প্রথম দিকে খুনের দায় অস্বীকার করেন । পরে তিনি আদালত কে জানান আত্ব রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি খুনটি করেছেন। রিয়াসত খান তার উপর যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল বলে আদালত কে জানিয়েছিলেন। যদি ও পুলিশ এই অভিযোগের পক্ষে কোন প্রমান পায়নি। এছাড়া রিয়াসত খান ইতিপুর্বে অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার প্রমানাদি আদালতে উপস্থাপন করে পুলিশ।
নমেম্ভর মাসের শুরুর দিকে রিয়াসত খানকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করে আদালত। রায় ঘোষনা কালে বিচারক লর্ড ব্রেকেট পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে জানতে চান , অপরাধী কি কারনে দীর্ঘ সময় ধরা ছোয়ার বাইরে ছিল এবং কেন তাকে আইনের এত দিন আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, ফরেনসিক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের প্রতি ধন্যবাদ জানান বিচারক। অবশেষে এডিনবরা হাইকোর্টে যুগান্তকারী এই মামলার চুড়ান্ত রায় অর্থাৎ শাস্তি ঘোষনা করা হয় গত ২৪শে নবেম্বর।
উল্লেখ্য, কাজী বশির আহমদের দেশের বাড়ী মৌলভীবাজার জেলার কনকপুর গ্রামে। ১৯৬০ সালে ব্রিটেনে আসেন। আবারডিনে রেষ্টুরেন্ট খোলার আগে তিনি পোর্টসমাউথ ও সাউথশীল্ডে বাস করতেন বলে জানা গেছে। ঘঠনার সময় তার বয়স ছিল ৩৮ বছর। বশির আহমদের স্ত্রী সাইদা বেগম (৭২) ও সন্তান রা বর্তমানে বসবাস করছেন ম্যাঞ্চেষ্টারে । একমাত্র ছেলে বাসিত আহমদের জন্ম হয় খুনের ঘঠনার ১১ দিন পর এবং এর কিছুদিন পর এক মেয়ে ও মারা যায়। বর্তমানে উনার ৩ মেয়ে রয়েছেন।
মামলার রায় প্রদান কালে আদালতে উপস্থিত ছিলেন কাজী বাসিত আহমদের নাতনী আয়শা বেগম (২৭) উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় মিডিয়ার কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আয়েশা বলেন –
“ আমি আমার নানা কে কখন ও দেখিনি, ঘটনার সময় আমার মায়ের ই বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। এই রায় হওয়াতে আমরা অনেক সন্তুুষ্ট। অনেক দেরীতে হলেও সুবিচার পাওয়া গেল ’’
“আদালতে যারা সাক্ষী দিলেন তাদের কথা শুনে আমি এটা বুঝতে পারলাম আমার নানা কতটা উদার, পরোপকারী এবং ব্যাবসায়ী হিসাবে সফল ব্যাক্তি ছিলেন’’
আয়েশা আর জানান – “আমার নানার চরিত্রে কালিমা লেপনের জন্য খুনী ব্যাক্তিটি নানা ধরনের বাজে কথা বলেছিল কিন্তুু তার সকল চেষ্টা ব্যার্থ হয়েছে। সে আমার নানা সম্পর্কে আদালতে অনেক মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল যা ছিল আমাদের জন্য মানহানিকর ’’
“আমার নানী এখন ও জীবিত, বর্তমানে তার বয়স ৭২ বছর। ঘঠনাটি যখন ঘঠে তখন আমার নানীর বয়স ছিল ৩১ কিংবা ৩২। একা একা অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে আমার মা, খালাদের তিনি মানুষ করেছেন। সুবিচার পাওয়ার আশায় তিনি দীর্ঘ ৩৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে’’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশ স্কটল্যান্ডের ডিটেকটিভ সুপারেনটেন্ড জিম স্মিথ বলেন – “ দীর্ঘ সময় পরে হলে ও অপরাধীর সাজা পেয়েছে । মামলার এই রায়ের ফলে মি: আহমদের পরিবারের সদস্যরা কিছুটা হলে ও স্বস্তি পাবে ’’
“যতটাই দীর্ঘ সময় লাগুক না কেন অপরাধ করে কেউ চিরতরে বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবে না’
আবারডিনের বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা সৈয়দ আব্দুল রাজ্জাক হাসিব বলেন – “যুগান্তকারী এই রায়ে আমরা সন্তুুষ্ট। স্কটিশ পুলিশ এবং প্রসিকিউটার কতৃপক্ষের প্রতি অসংখ্য ধন্যবাদ’’
অপর স্থানীয় কমিউনিটি নেতা আব্দুল মোছাব্বির যিনি এই ঘটনার পরে অবারডিনে আসেন, তিনি বলেন – “স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশী ক্যাটারিং সেক্টরকে প্রতিষ্টা করতে অতীতকালে যারা ভুমিকা রেখে গেছেন তাদের মধ্যে কাজী বশির আহমদের ভুমিকা ছিল অগ্রগন্য। যে কর্মচারী কে তিনি কাজ দিয়েছেন, থাকার জায়গা দিয়েছেন সেই লোকটি তার বসকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘঠনাটি ছিল আমাদের সবার জন্য মর্মান্তিক। খুনের দায়ে অপরাধী যে শাস্তি পেয়েছে তাতে আমরা কিছুটা হলে ও স্বস্তি পাচ্ছি’’

 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 2198 বার
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

ক্যালেন্ডার