আজকে

  • ১০ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
  • ২৪শে জুন, ২০১৮ ইং
  • ৮ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

চিরঘুমে লোকসংগীতের মহীরুহ

Published: শনিবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৭ ৭:২২ পূর্বাহ্ণ    |     Modified: বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭ ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ
 

বিনোদন ডেস্ক:

দরদি কণ্ঠসুধা আর মায়াবী উপস্থাপনায় বাংলার ঐতিহ্যবাহী মরমি গানের এক অন্যরকম আবহ তৈরি করেছিলেন যে শিল্পী তিনি বারী সিদ্দিকী। দেশীয় লোকসংগীতের এক মহীরূহ। ইহলোকের সব মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেছেন তিনি। ‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’- গানগুলোর প্রখ্যাত এ শিল্পী আর নেই। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিলো ৬৩ বছর।
বারী সিদ্দিকীর দু’টি কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো।

এর পাশাপাশি তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। গত ১৭ই নভেম্বর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হন এ শিল্পী। এরপর তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যওয়াা হয়, তখন তিনি অচেতন ছিলেন। তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। গত কয়েকদিন ধরে তিনি সেখানেই লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বারী সিদ্দিকী বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকালই খ্যাতিমান এ সংগীতশিল্পীকে দাফন করা হয় নেত্রকোনার কারলি গ্রামে ‘বাউল বাড়ি’তে। এ তথ্য জানিয়েছেন তার বড় ছেলে সাব্বির সিদ্দিকী। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই গোসল করানোর জন্য মোহাম্মদপুরে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে নিয়ে যাওয়া হয় বারী সিদ্দিকীর মরদেহ। সেখান থেকে মরদেহ গতকাল সকাল ৭টায় ধানমন্ডি ১৪/এ সড়কে তার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বারী সিদ্দিকীর প্রথম জানাজা হয় গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হয় দ্বিতীয় জানাজা। বাদ আসর তৃতীয় ও শেষ জানাজা হয় নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। এরপর তাকে কবরস্থ করা হয়।
প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী, বংশীবাদক ও গীতিকার বারী সিদ্দিকী মিশে গিয়েছিলেন জন্মস্থান পূর্ব ময়মনসিংহের লোকায়ত সংগীতের প্রবাহে। তার গান শুনে মনে হয়, শুধু বাংলার মানুষের জীবনধারা নয়, বরং নানা ধর্মের প্রার্থনায়, বিভিন্ন মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপনে লোকসংগীত জড়িয়ে আছে শক্তভাবে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর বাউল গানের সুরে মাতোয়ারা হননা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। হাজার বছর পরেও আবেদন ফুরায়না এসব গানের। এমন গানই বারী সিদ্দিকী পরম ভালোবাসায় গলায় তুলে নিয়েছিলেন। গুণী এ শিল্পীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৫ই নভেম্বর বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলায়। তার পুরো নাম আবদুল বারী সিদ্দিকী, বাবা প্রয়াত মহরম আলী ও মা প্রয়াত জহুর-উন-নিসা। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বারী সিদ্দিকী ছিলেন সবার ছোট। বয়স যখন তিন কিংবা চার সে সময়েই মায়ের কাছে তার প্রথম শোনা গান ছিলো ‘শাশুড়িরেও কইয়ো গিয়া’। সেই গানের সুরই বারীর মনে গেঁথে যায় পোক্তভাবে। সেসূত্রে শৈশবেই গান শেখায় হাতেখড়ি হয় তার। মাত্র ১২ বছর বয়সে নেত্রকোনার ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ অসংখ্য গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন। সত্তরের দশকে বারী সিদ্দিকী জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্লাসিক্যাল সংগীতের উপর পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হন তিনি। সে ধারাবাহিকতায় বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গসংগীতে প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। আর দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সঙ্গে ক্ল্যাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ‘রঙের বাড়ই’ নামের একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। এরপর ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন। এর মধ্যে ‘শুয়া চান পাখি’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৯ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশ নেন। তার গাওয়া গান নিয়ে ডজনখানেক অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘অন্তর জ্বালা’, ‘দুঃখ রইল মনে’, ‘ভালোবাসার বসতবাড়ি’ ইত্যাদি। বারী সিদ্দিকী ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছাড়া আরো বেশকিছু চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে- ‘রূপকথার গল্প’, ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’, ও আমার দেশের মাটি প্রভৃতি। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শুয়াচান পাখি’, ‘পূবালি বাতাসে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’, ‘একটা জিন্দা লাশ’, ‘মাটির দেহ’, ‘মাটির মালিকানা’, ‘মানুষ’, ‘মা’ প্রভৃতি।
বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে শোক
বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী, বংশীবাদক ও গীতিকার বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের এই শিল্পীর মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের মানুষ একজন জনপ্রিয় বাংলা লোকসংগীত শিল্পীকে হারালো। তিনি আরও বলেন, যতদিন লোকসংগীত থাকবে, ততদিন বারী সিদ্দিকী বেঁচে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এক শোকবার্তায় বারী সিদ্দিকীকে লোকগান ও আধ্যাত্মিক গানের একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তার গান এ দেশের সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল। তার কণ্ঠে মরমি গানে সংগীতপ্রিয় মানুষ মোহাবিষ্ট থাকত। তার মৃত্যুতে দেশ হারাল অসাধারণ একজন গুণী শিল্পীকে, যার অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বারী সিদ্দিকীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। চেয়ারপারসনের পাশাপাশি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করেছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, এমপি এক শোকবার্তায় মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। এদিকে বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে আরো বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন গভীর শোক জানিয়ে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছে।

 
 
 

এই বিভাগের আরও সংবাদ

 

ক্যালেন্ডার